পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: শোকের মধ্যেও ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল কেরলের একটি পরিবার। গুরুতর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হওয়ার পর নিজের অঙ্গদানের মাধ্যমে একাধিক মানুষের জীবন বাঁচিয়ে গেলেন কেরলের ৪২ বছর বয়সি মুসলিম আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক সজনা এসএ।

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, কেরলের বাসিন্দা সজনা গত ছয় মাস ধরে ভোপালে কর্মরত ছিলেন। গত ১৫ মে আচমকা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ভোপালের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসা চললেও অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়।

পরে তাঁকে ব্রেন-স্টেম ডেড ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। রোগ নির্ণয়ের পর হাসপাতালের চিকিৎসক ও অঙ্গ প্রতিস্থাপন সমন্বয়কারীরা পরিবারের সঙ্গে অঙ্গদানের বিষয়ে আলোচনা করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর শোকের মুহূর্তেও সজনার পরিবার অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্তের ফলেই বেঁচে যায় তিনটি প্রাণ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি জাতীয় অঙ্গ ও টিস্যু প্রতিস্থাপন সংস্থা (এন ও টি টি ও)-র নির্ধারিত নির্দেশিকা মেনে সম্পন্ন করা হয়েছে। সজনার যকৃৎ ও একটি কিডনি ভোপালের একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়।

তাঁর দ্বিতীয় কিডনি অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তা জরুরি প্রয়োজনে থাকা এক রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

বানসাল হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ এস কে ত্রিবেদী বলেন, এই কঠিন সময়ে পরিবার অসাধারণ সহানুভূতি ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। তাঁর কথায়, গ্রহীতার ধর্ম বা পরিচয় নিয়ে পরিবারের কোনও বিশেষ পছন্দ আছে কি না জানতে চাওয়া হলে সজনার স্বামী একটাই কথা বলেন, যার প্রয়োজন, তাকেই দিয়ে দিন।চিকিৎসকদের মতে, ব্রেন-স্টেম ডেথ হলে মস্তিষ্কের সমস্ত কার্যকারিতা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ভেন্টিলেটরের সাহায্যে হৃদস্পন্দন কিছু সময় চালু রাখা গেলেও রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার কোনও সম্ভাবনা থাকে না।

এই অবস্থায় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে অঙ্গ সংরক্ষণ করে প্রতিস্থাপন করলে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

অঙ্গ সংগ্রহের পর সজনা এসএ-র লাশ পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মান জানিয়ে বিদায় জানানো হয়। পুলিশ, হাসপাতালের কর্মী ও উপস্থিত অন্যরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। পরে তাঁর লাশ দাফনের জন্য কেরলের তিরুবনন্তপুরমে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনা ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বহু মানুষ সজনার পরিবারের সিদ্ধান্তকে ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতার অনন্য নজির বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ লিখেছেন, মানবতাই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। আবার অনেকেই এটিকে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহমর্মিতা এবং নিঃস্বার্থ মানবিকতার বিরল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। চিকিৎসকদের মতে, এই ঘটনা অঙ্গদান সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।