হজ ও কোরবানি মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দুটি ইবাদত। এ দুটি ইবাদতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অনন্য আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহভীতির ইতিহাস। কোরবানি ইসলামি শরিয়তের এক মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত, যার সূচনা হয়েছিল হজরত আদম (আ.)-এর সময় থেকে। তবে ঈদুল আজহা ও কোরবানির প্রকৃত মহিমা প্রকাশ পায় হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগের ঘটনার মাধ্যমে।
আরও পড়ুন:
ইসলামি শরিয়তে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলমান নারী-পুরুষের জন্য কোরবানি ওয়াজিব। অন্যদিকে শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবে কোরবানিকে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিনা কারণে এ ইবাদত পরিত্যাগ করা মাকরুহ।আরও পড়ুন:
অন্যদিকে, শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম মুসলমানের জন্য হজ ফরজ ইবাদত। জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য আবশ্যক। মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবে হজ বিশেষ মর্যাদা বহন করে। হজের অন্যতম প্রধান অংশ হলো ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দান-এ অবস্থান করা।
আরও পড়ুন:
আরাফাতের ময়দানে লাখো হাজি “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক” ধ্বনিতে মুখর হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে নিজেদের সমর্পণ করেন। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ একই পোশাকে এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ করেন।
এই মহাসমাবেশ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সৌহার্দ্য ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক। হজ মানুষের আত্মশুদ্ধি, গুনাহ মাফ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহাসুযোগ এনে দেয়।আরও পড়ুন:
পবিত্র কোরআনে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে মুসলিম জাতির পিতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঈদুল আজহার দিন মুসলমানরা তাঁর সুন্নত অনুসরণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন। কোরবানি মূলত আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার প্রতীক। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।
কোরবানি মানুষকে ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবতার শিক্ষা দেয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,“হে ইমানদারগণ! তোমরা তোমাদের উপার্জিত হালাল সম্পদ এবং জমিন থেকে উৎপন্ন বস্তু থেকে ব্যয় করো।” (সুরা বাকারা : ২৬৭)
তাই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি, আল্লাহভীতি ও মানবসেবায় আত্মনিয়োগ। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ মানবকল্যাণে ব্যয় করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়াই কোরবানির মূল চেতনা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
“আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছে না, পৌঁছে কেবল তোমাদের তাকওয়া।” (সুরা হজ : ৩৭)
এ কারণে কোরবানির বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে অন্তরের তাকওয়া ও নিষ্ঠাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদের দিন গোসল করে ঈদগাহে যাওয়া এবং পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরিধান করাও সুন্নত। হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন গোসল করতেন।
ত্যাগ, তাকওয়া, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার মহান শিক্ষা নিয়েই প্রতি বছর মুসলিম উম্মাহর জীবনে ফিরে আসে ঈদুল আজহা। এই শিক্ষা ব্যক্তি, সমাজ ও বিশ্বজীবনে শান্তি, সৌহার্দ্য ও কল্যাণের বার্তা ছড়িয়ে দেয়।