মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. আদর্শ মানুষ, কোনও ফেরেশতা নন। আমরা তাঁর সমগ্র জীবনচর্চাকালে লক্ষ্য করি, তিনি সত্যবাদী, সংগ্রামী, আদর্শনিষ্ঠ সাধক, বিশ্ব সংস্কারক, সর্বোপরি ব্যক্তি সমস্যা থেকে বিশ্ব সমস্যার সমাধানকারী। মানুষ কিভাবে বা কোন গুণে পূর্ণতা লাভ করতে পারে, কীভাবে একজন মানুষ সত্য ও সুন্দরের সন্ধান পান; ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে মানুষ শান্তিময় জীবন-যাপন করতে পারেন--- এরই সন্ধান দিয়েছেন মহানবী সা.। সবথেকে বড় কথা--- পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত এমন মানুষ এখনও আবির্ভূত হননি--- যাঁর মধ্যে সর্বাঙ্গসুন্দর পূর্ণতা আছে, যাঁর জীবনের আদি থেকে অন্ত--- সবই খোলাপাতা। ফলে তিনি স্বয়ং বিপ্লব এবং সমকালীন সভ্যতার সংকট থেকে মুক্তির দিশারী ও পথপ্রদর্শক। লিখেছেন ড. সেখ আবু তাহের কমরুদ্দিন
পৃথিবীতে অসাধারণ মানুষ অনেক জন্মেছে এবং জন্মে থাকে, যারা কোনও ভালো শিক্ষার কোনও গঠনমূলক চিন্তা সমাজে উপস্থাপন করে। এদেরকে অসাধারণ মানুষ বলা হয়। যারা নৈতিকতার ও আইনের বিধান নিয়ে চিন্তা গবেষণা করে তাদেরও মহৎ ও অসাধারণ মানুষ বলা হয়। এই অসাধারণ খেতাবটি সেই সব লোককেও দেওয়া হয়, যারা দেশ জয় করেছে, বীরোচিত কীর্তির উত্তরাধিকার রেখে গেছে, যারা সাম্রাজ্য পরিচালনা ও শাসন করেছে, যারা দারিদ্র্য ও অভাবের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং যারা বিশ্ববাসীর সামনে ব্যক্তিগত চরিত্রের অত্যন্ত উঁচুমানের মানদন্ড স্থাপন করেছে, তাদেরকেও। কিন্তু রাসূল সা.-এর জীবনের প্রতিটি দিক অন্যান্য দিকের সঙ্গে পুরোপুরি ভারসাম্যপূর্ণও এবং প্রতিটি দিক একইরকম পূর্ণতা ও উৎকৃষ্টতা দ্বারা শোভিত। যেখানে গুরুগম্ভীরতার প্রতাপ রয়েছে সেখানে সৌন্দর্যের চমকও রয়েছে। সেখানে আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি রয়েছে বৈষয়িকতার সমন্বিত অবদান।
পরকালের চর্চার পাশে হাত ধরাধরি করে রয়েছে অর্থনৈতিক চিন্তাধারা। দ্বীনের সঙ্গেই রয়েছে দুনিয়াও। এক ধরনের আত্মনিবেদিত ভাব থাকলেও সেই সঙ্গে আত্মমর্যাদাবোধও রয়েছে অম্লান। আল্লাহর ইবাদাত বন্দেগির পাশাপাশি বিরাজ করছে আল্লাহর বান্দাহদের প্রতি স্নেহ, মমতা ও তাদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। কঠোর সামষ্টিক শৃঙ্খলার সঙ্গে রয়েছে ব্যক্তির অধিকারের প্রতি সম্মানও। প্রগাঢ় ধর্মীয় চেতনা ও আবেগের সঙ্গেই অবস্থান করছে সর্বাত্মক রাজনীতিও।আরও পড়ুন:
রাসূল সা.-এর জীবনচরিতরূপী এই পাঠশালা থেকে সমভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে একজন প্রশাসক, একজন শাসনকর্তা, একজন মন্ত্রী, একজন কর্মকর্তা, একজন মনিব, একজন চাকুরে, একজন ব্যবসায়ী, একজন শ্রমিক, একজন বিচারক, একজন শিক্ষক, একজন সিপাহী, একজন বক্তা, একজন নেতা, একজন সংস্কারক, একজন দার্শনিক এবং একজন সাহিত্যিকও। সেখানে একজন পিতা, একজন সহযাত্রী ও একজন প্রতিবেশীর জন্য একইরকম অনুকরণীয় আদর্শ রয়েছে। একবার কেউ যদি এই পাঠশালায় পৌঁছে যায়, তাহলে তার আর অন্য কোনও পাঠশালায় যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। মানবতার সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম উৎকর্ষ অর্জন করা সম্ভব, তা এই একক ব্যক্তিত্বেই পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান। এজন্যই আমি এই ব্যক্তিকে ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ’ বা ‘মহামানব’ বলে আখ্যায়িত করতে বাধ্য হয়েছি। সমগ্র মানবেতিহাসে ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ’ কেবল এই একজনই।
পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তাঁর কাছ থেকে আলো গ্রহণ করেছে। আজ পৃথিবীর দিকে দিকে তার বাণী গুঞ্জরিত হচ্ছে। পৃথিবীর এমন কোনও মানুষ নেই, যে এই শ্রেষ্ঠ মানুষ থেকে কোনও না কোনও পর্যায়ে উপকৃত হয়নি।রাসূল সা.-এর ব্যক্তিত্বের পরিচয় এবং তাঁর বাণীর বিশ্বময় প্রচার ও প্রসার তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল তথা মুসলিম জাতিরই দায়িত্ব ছিল। কিন্তু এই জাতি নিজেই তাঁর ও তাঁর বাণী থেকে অনেক দূরে পড়ে রয়েছে। মুসলমানদের কাছে রক্ষিত ধর্মগ্রন্থের পাতায় পাতায় জীবনের সকল দিক সম্পর্কে দিক নির্দেশনা রয়েছে, কিন্তু তাদের জীবনে এই মহামানবের জীবনীর কোনও প্রভাব পড়ছে বলে মনে হয় না। এই জাতির ধর্মীয় জীবনে, রাজনীতিতে সমাজ জীবনে, নৈতিকতায়, আইন ব্যবস্থায় ও সংস্কৃতিতে নবী জীবনের আদর্শের খুব কমই ছাপ অবশিষ্ট রয়েছে। যা রয়েছে তাও অনেক নতুন নতুন ছাপের সঙ্গে মিশে বিকৃত হয়ে গেছে। এই জাতির সামাজিক পরিবেশ পৃথিবীর কোনও একটি ক্ষুদ্রতম অংশেও এমন অবস্থায় নেই, যা দ্বারা বোঝা যায় যে তারা মুহাম্মদ সা.-এর নীতি, আদর্শ, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতিনিধি। বরঞ্চ এ জাতি পৃথিবীর বিভিন্ন বিভ্রান্ত ও বাতিল ব্যবস্থার দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা চেয়ে বেড়াচ্ছে এবং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত শক্তির ভয়ে নিজেদের গৌরবময় ঐতিহ্য সম্পর্কে লজ্জিত বলে মনে হয়।
অথচ তিনি এসেছিলেন সমগ্র মানব জাতির নেতা হয়ে এবং সমগ্র মানব জাতির জন্য বাণী ও আদর্শ নিয়ে। তার জীবনেতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা দরকার ছিল যে, তা মনুষ্যত্বের একটা নমুনা ও আদর্শ।
মানুষ এর ছাঁচে ঢালাই হয়ে তৈরি হলে সে নিজের ও সমগ্র মানব জাতির কল্যাণের উপকরণ হতে পারে এবং রকমারি সমস্যার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে একটা পবিত্র নিষ্কলুষ ও নিষ্কন্টক জীবন অর্জন করতে পারে। রাসূল সা.-এর বাণী ও জীবনাদর্শ প্রকৃতপক্ষে সূর্যের কিরণ, বৃষ্টির পানি ও বাতাসের মত সার্বজনীন কল্যাণের উৎস। অথচ আমরা তাকে নিজেদের অজ্ঞতার দরুণ একটা গোষ্ঠীগত বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছি। আজ প্লেটো, সক্রেটিস, ডারউইন, মেকিয়াভেলী, মার্কস, ফ্রয়েড ও আইনস্টাইন থেকেও সকল দেশ ও সকল ধর্মের লোকদেরকে কমবেশি উপকৃত হতে ও শিক্ষা গ্রহণ করতে দেখা যায়। তাদের বিরুদ্ধে কোনও জাতি বা গোষ্ঠীর কোনও দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ নেই। কিন্তু মুহাম্মদ সা.-এর জ্ঞান, আর্দশ ও নেতৃত্ব থেকে শিক্ষা গ্রহণে এত আপত্তি ও বিদ্বেষ যে, তার ইয়ত্তা নেই। লোকেরা ভাবে যে, মুহাম্মদ সা. তো মুসলমানদের নেতা। আর আমরা মুসলমানদের নেতা ও পথ প্রদর্শকের সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক? দুঃখের বিষয় হল, এরূপ ধারণা সৃষ্টিতে এবং এর এতটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে উপনীত হওয়াতে আমাদের নিজস্ব কর্মকান্ডেরও যথেষ্ট হাত রয়েছে। সমগ্র মানবজাতির বন্ধু এবং মুহাম্মদ সা.-এর উম্মত হয়েও আমরা তাঁর অনুকরণের অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি বলেই অমুসলিম জনগণের মধ্যে এরূপ চিন্তাধারা জন্ম নিতে পেরেছে।বর্তমানে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়েছে চুল, উম্মতরূপে আমরা আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কতটা সম্পন্ন করেছি, পাশ্চাত্য সভ্যতার বিলাসি জীবনে অভ্যস্থ বর্তমান উম্মাহ্ পৃথিবীর অন্যান্য জাতির বিভ্রান্তিমূলক নীতি এবং আদর্শকে আঁকড়ে ধরে নিজেদের গৌরবময় ঐতিহ্যকে ভুলতে বসেছে। আগামী প্রজন্ম এবং অমুসলিম মননে ও চিন্তনে নবী করিম সা.-এর বানী ও আদর্শকে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব ও আশু কর্তব্য।