পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক : মুর্শিদাবাদ জেলার নূরপুর থেকে গুম হওয়া ইব্রাহিম শেখ এখন কোথায় আছেন, তা জানার উদ্দেশে হেবিয়াস কর্পাসের আবেদন দাখিল করা হয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টে। এই আবেদন দাখিল করেছিলেন ইব্রাহিম শেখের বৃদ্ধা মা হানিফা বেওয়া। বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে এই আবেদন অনুযায়ী মামলাটির শুনানি হয়। মামলাটি যে গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় শুনানির সময় হাজির হয়েছিলেন ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে ছিলেন অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল ধীরজ ত্রিবেদী, কুমার জ্যোতি তিওয়ারি, অনামিকা পান্ডে প্রমুখ। রাজ্যের পক্ষে ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট গভর্নমেন্ট প্লিডার দেবাশীষ বাসু ও স্নেহা দত্ত।
সুদূর নূরপুর মুর্শিদাবাদের এক প্রত্যন্ত এলাকা। সেখান থেকে কলকাতায় এসে আইনজীবীর দ্বারস্থ হয়ে হেবিয়াস কর্পাসের জন্য আবেদন করা সহজ বিষয় নয়। কিন্তু এ কাজে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসেন অ্যাডভোকেট নূর হোসেন জমাদার। তিনি এই মামলাটিতে নিজে দাঁড়িয়েছেন এবং আরও ৩ জন খ্যাতনামা অ্যাডভোকেটকে মা হানিফা বেওয়ার-এর এই আবেদনের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য রাজি করিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ইব্রাহিম শেখকে নুরপুর এলাকার রমাকান্তপুর থেকে ২৯ জুলাই, ২০২৬ রাতে আনুমানিক ১টার সময় সিভিল পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি তার বাড়িতে আসেন। ওইদিন ঘটনাক্রমে পরিবারের অন্য কোনও সদস্য বাড়িতে ছিল না।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পরিবারকে বলা হয়, ইব্রাহিম শেখকে নাকি বাংলাদেশি স¨েহ করে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার সন্ধান চেয়ে দায়ের হওয়া হেবিয়াস কর্পাস মামলায় কলকাতা হাইকোর্টে শুনানি হল ১০ সেপ্টেম্বর। ইব্রাহিম শেখ বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, তিনি ভারতের নাগরিক কি না, তার জন্মদাত্রী মা কে? এই সমস্ত প্রশ্ন শুনানির সময় কেন্দ্র ও রাজ্যের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ২২ সেপ্টেম্বর। তার আগে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত বলে মামলার আইনজীবী জানিয়েছেন। ইব্রাহিম শেখের মা হানিফা বেওয়ার দায়ের করা মামলার শুনানিতে ইব্রাহিম শেখের পক্ষে চারজন আইনজীবী সওয়াল করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও প্রতিনিধিত্ব করা হয়। মামলার আইনজীবী নূর হোসেন জমাদারের বক্তব্য, শুনানির শুরুতেই অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল রিট পিটিশনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইব্রাহিম শেখ ‘বাংলাদেশি’ বলে অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল হেবিয়াস কর্পাস রিটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সেই সময় আদালতের মাননীয় বিচারপতি হস্তক্ষেপ করে জানান যে, রিটটি গ্রহণযোগ্য এবং মামলার নথিপত্র ও বিষয়টি আদালত গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে। এরপর ইব্রাহিম শেখের নাগরিকত্ব এবং তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের আইনগত দিক নিয়েও সওয়াল হয়। ইব্রাহিম শেখের পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে বলেন, যদি কোনও কারণে পরিবারের সদস্যদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে, তাহলে একই পরিবারের ক্ষেত্রে কেন শুধুমাত্র ইব্রাহিম শেখের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হল, সেই প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতও এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত বলে আদালতকে বলা হয়। সেই প্রসঙ্গে আদালত পর্যবেক্ষণ করে জানায়, কোনও বৈধ বা আইনসম্মত নাগরিককে কোনওভাবেই দেশ থেকে বহিষ্কার করা সম্ভব নয়। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি এবং পরবর্তী শুনানিতে বিভিন্ন পক্ষের হলফনামা ও বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
শুনানিতে ইব্রাহিম শেখের মা হানিফা বেওয়ার পরিচয় নিয়েও সরকার পক্ষ প্রশ্ন তোলে। সরকারের তরফে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে তাকে ইব্রাহিম শেখের বায়োলজিক্যাল মা নয় বলে জানানো হয়। ফলে হানিফা বেওয়া ইব্রাহিম শেখের জৈবিক মা, দত্তক মা নাকি অন্য কোনও পারিবারিক সম্পর্কের ব্যক্তি, সেই বিষয়টি স্পষ্ট করতে আদালত নির্দেশ দেয়।
পাশাপাশি, ইব্রাহিম শেখের বর্তমান অবস্থান ও তাকে নিয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপের বিষয়ে কেন্দ্র এবং রাজ্য--- দুই পক্ষকেই নিজেদের বক্তব্য জানাতে বলা হয়েছে। মামলার আইনজীবীর বক্তব্য, রাজ্যের পক্ষ থেকে ইব্রাহিম শেখকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করা হয়নি। কেন্দ্রের তরফে তথ্য সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইব্রাহিম শেখ বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি রয়েছে বলে পরিবারের দাবি। আদালত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে সাতদিনের মধ্যে হলফনামা জমা দিতে বলেছে। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর ফের মামলাটির শুনানির জন্য হাইকোর্ট দিন ধার্য করেছে।