উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়: জীবনে একবার হলে ও কৈলাস ও মানস সরোবর দর্শন করবেন—দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন ছিল ডায়মন্ড হারবারের সরিষার ভান্ডারী পাড়ার বাসিন্দা কেয়া প্রামাণিকের।আর সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই গত ২১ শে অগস্ট সহকর্মীদের সঙ্গে নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন ৫৭ বছরের কেয়া। পেশায় তিনি ক্যানিংয়ের তালদি সুরাবালা গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকা। পাহাড় এবং ভ্রমণের প্রতি বরাবরই ছিল তাঁর বিশেষ টান। কিন্তু নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর থেকেই তাঁর কোনও খোঁজ না মেলায় এখন গভীর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে পরিবার।পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে নেপালে গিয়েছিলেন কেয়া। সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৈলাস ও মানস সরোবর দর্শন। নেপালে পৌঁছনোর পর পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখছিলেন তিনি। কিন্তু গত ২৩ শে অগস্ট শেষ বার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।এর মধ্যেই নেপালের উত্তরাঞ্চলে প্রবল বৃষ্টি ও হড়পা বানের খবর সামনে আসে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিস্তীর্ণ এলাকায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বহু পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দার অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

সেই পরিস্থিতিতেই কেয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় পরিবারের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়তে থাকে।বারবার ফোন করেও সাড়া না মেলায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন কেয়ার পরিজনেরা। তিনি ঠিক কোথায় রয়েছেন, নিরাপদে আছেন কি না, তাঁর সঙ্গে থাকা সহকর্মীদের কী অবস্থা—কোনও প্রশ্নেরই এখনও নিশ্চিত উত্তর মেলেনি।
কেয়ার ভাই ধীরাজ রায় জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর দিদির খেলাধুলা এবং ঘোরাঘুরির প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল।বিশেষ করে পাহাড় তাঁকে বরাবরই আকৃষ্ট করত। সুযোগ পেলেই তিনি পাহাড়ে বেড়াতে যেতেন।ধীরাজ রায়ের কথায়, “দিদি ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার মধ্যে বড় হয়েছে। ঘুরতে খুব ভালবাসত।পাহাড়ের প্রতি একটা আলাদা টান ছিল। প্রতিবছরই পাহাড়ে যেত।এবার ২১ শে অগস্ট নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল কৈলাস এবং মানস সরোবর দর্শন করার জন্য।২৩ শেঅগস্ট শেষবার আমাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল।
এরপর থেকে আর কোনও খোঁজ পাচ্ছি না।”
পরিবারের তরফে জানা গিয়েছে, যে সংস্থার মাধ্যমে কেয়া এবং তাঁর সহকর্মীরা নেপালে গিয়েছিলেন, সেই সংস্থার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তাঁদের মাধ্যমেও কেয়ার অবস্থান জানার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরেও তাঁর খোঁজ পাওয়ার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নেপালের পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত কোনও খবর মেলেনি।
পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে এই কারণে যে, আগামী ৭ ই সেপ্টেম্বর কেয়ার দেশে ফেরার কথা ছিল। অর্থাৎ আরও কয়েকদিন নেপালে থাকার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। যে সফরকে ঘিরে পরিবারে আনন্দ এবং অপেক্ষা ছিল, ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর সেই সফরই এখন পরিণত হয়েছে উৎকণ্ঠার কারণ।
ধীরাজ রায় বলেন, “৭ই সেপ্টেম্বর দিদির বাড়ি ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু নেপালের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর পাওয়ার পর থেকে আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছি। দু’চোখের পাতা এক করতে পারছি না। দিদি কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুই জানি না।
যে সংস্থা নিয়ে গিয়েছিল, তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করছি। প্রশাসনের কাছ থেকেও যাতে কোনও ভাবে দিদির খবর পাওয়া যায়, সেই চেষ্টা করছি।”কেয়ার নিখোঁজ হওয়ার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়তেই পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় বিজেপি নেতা উত্তম বাগ।খবর পেয়ে কেয়ার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে যান ডায়মন্ড হারবার বিজেপি সাংগঠনিক জেলার ২ নম্বর মণ্ডলের সভাপতি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি কেয়াকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনিক স্তরে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।উত্তম বাগ বলেন, “দিদি আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। ছোটবেলায় আমরা একসঙ্গে খেলাধুলা করেছি। দিদি আমাদের সরিষার গর্ব। এই মুহূর্তে তাঁর পরিবারের পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব।দিদিকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনিক স্তরে যত রকম সাহায্য প্রয়োজন, আমরা করব।”একদিকে নেপালের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার ও সন্ধান অভিযান চলছে, অন্যদিকে ডায়মন্ড হারবারে উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে কেয়ার পরিবারের। কখন মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে প্রিয় মানুষের একটি ফোন আসবে, সেই অপেক্ষাতেই রয়েছেন তাঁর পরিজনেরা।কৈলাস মানস সরোবর দর্শনের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন নিয়ে যে মানুষটি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, তিনি যেন সুস্থ ও নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে আসেন—এখন সেটাই প্রার্থনা কেয়ার পরিবার, প্রতিবেশী এবং পরিচিতদের।