পুবের কলম, ওয়েব ডেস্কঃ সাম্প্রতিক কাজকর্মের ভিত্তিতে জাতীয় মহিলা কমিশনের ভূমিকা নিয়েই এবার প্রশ্ন তুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ সুষ্মিতা দেব। শুক্রবার তিনি অভিযোগ করেছেন, এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি এখন আর নারীর অধিকার রক্ষার স্বার্থে কাজ করছে না, বরং তা কেন্দ্রের শাসক দলের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এদিন সংসদের মহিলা উন্নয়ন সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান দিগ্বিজয় সিংয়ের কাছে একটি চিঠি দেন তৃণমূল সাংসদ সুষ্মিতা দেব। যেখানে স্পষ্ট ভাষায় জাতীয় মহিলা কমিশনের ভূমিকা, নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
চিঠিতে তিনি সাম্প্রতিক একাধিক নারী নির্যাতনের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন, যেখানে কমিশনের নীরবতায় কমিশনের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের উদাহরণ স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, অসমের তিনসুকিয়া জেলায় একজন মহিলাকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল, আর বিহারে এক ডাক্তারকে গাছে বেঁধে লোহার রড দিয়ে মারা হয়, কারণ তিনি একজন ধর্ষিতার মায়ের চিকিৎসা করেছিলেন। এই দুই ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়ালেও জাতীয় মহিলা কমিশন কোনো তথ্য সংগ্রহ বা সফরের উদ্যোগ নেয়নি। অথচ পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল শাসিত রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে কোনো ঘটনা ঘটলেই জাতীয় মহিলা কমিশন তৎপর হয়ে যায়। সুষ্মিতার বক্তব্য, এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় কমিশন তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে চলছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে কমিশনের তরফে আইনি সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা সরকার কার্যকর করেনি। ২০১৪ সালে নতুন একটি বিল আনলেও তা পরে বাতিল করা হয়। ফলে ১৯৯০ সালের পুরনো আইনেই চলছে কমিশনের কাজ, যার ফলে তারা বাস্তব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে না। অথচ নারীর অধিকারের সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী এবং কার্যকরী কমিশন থাকা আজ সময়ের দাবি।
সুষ্মিতা দেব অভিযোগ করেন, জাতীয় মহিলা কমিশন বর্তমানে নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে কমিশনের আর্থিক ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি সরকারের ইচ্ছাধীন হয়ে পড়েছে। কমিশন নিজে থেকে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না, তার সুপারিশগুলি বাধ্যতামূলক নয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকার তা আমলই দেয় না। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে জাতীয় মহিলা কমিশনের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করে, কোন ঘটনায় কমিশন হস্তক্ষেপ করবে আর কোন ঘটনায় করবে না, সেই সিদ্ধান্তও রাজনৈতিকভাবে নেওয়া হয়। ফলে একদিকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উপেক্ষিত থেকে যায়, অন্যদিকে কমিশনের তৎপরতা পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হয়।
তিনি এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যা দেন এবং জানান, জাতীয় মহিলা কমিশন বর্তমানে সরকারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিতে চালিত হচ্ছে, তার নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক গুরুত্ব মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। তাঁর মতে, নারী অধিকার রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থা যদি নিজেই নিরপেক্ষতা হারায়, তাহলে তা দেশের গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে গভীর হুমকি।
চিঠির শেষে তিনি সংসদীয় কমিটির কাছে জোরালোভাবে তিনি দাবি জানিয়েছেন, অবিলম্বে জাতীয় মহিলা কমিশনের আইনি কাঠামো, প্রশাসনিক স্বাধীনতা এবং আর্থিক স্বনির্ভরতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা ও সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। সেই সঙ্গে তিনি চান, কমিশন যাতে শাসকের নয়, দেশের সমস্ত নারীর অভিভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে, সেই দিকেই দৃষ্টি দেওয়া হোক। তিনি মনে করছেন, কমিশনকেও নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে হবে, তবেই নারী সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে কমিশন তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারবে।
এই চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক মহলে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই সুষ্মিতা দেবের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার বা কেন্দ্রের শাসক দলের তরফে এখনও পর্যন্ত এই নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি। এখন দেখার, সংসদীয় কমিটি এই চিঠিকে কতটা গুরুত্ব দেয় এবং কেন্দ্র সরকার জাতীয় মহিলা কমিশন সংস্কারের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কি না!




























