ইউরোপজুড়ে চলতে থাকা ভয়াবহ তাপপ্রবাহের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব দেখা যাচ্ছে ফ্রান্সে। প্রচণ্ড গরমে দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে তীব্র গরম থেকে স্বস্তি পেতে নদী, হ্রদ ও বিভিন্ন জলাশয়ে নামার পর ডুবে মারা গেছেন আরও অন্তত ৪০ জন। ক্রমশ অবনতি হওয়া পরিস্থিতির জেরে ফ্রান্সের ৫৪টি অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে জাতীয় আবহাওয়া বিভাগ।

ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ১৯৪৭ সাল থেকে তাপমাত্রার তথ্য সংরক্ষণের ইতিহাসে এবারই রেকর্ড হয়েছে সর্বোচ্চ রাতের তাপমাত্রা। গত সোমবার রাতে দেশটির ৩০টি আবহাওয়া কেন্দ্রের গড় তাপমাত্রা ছিল ২১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এর আগে ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই রাতের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি তাপপ্রবাহ সেই রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছে।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে, পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি বলেন, তাপপ্রবাহের সময় অননুমোদিত বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সাঁতার কাটার প্রবণতা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে।

গরমের প্রকোপে একাধিক মর্মান্তিক ঘটনার খবরও সামনে এসেছে। সিন নদীতে ডুবে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে।

এছাড়া দক্ষিণ ফ্রান্সের কার্পেনট্রাস শহরে রোদে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির ভেতর থেকে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লিঁও শহরের কাছে রোন নদী থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার হওয়া এক তরুণ ফুটবলার বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

শুধু ফ্রান্স নয়, ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তাপপ্রবাহ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইতালির রোম, মিলানসহ ১৫টি শহরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। কৃষি ও নির্মাণ শ্রমিকদের সুরক্ষায় সরকার জরুরি শ্রম সুরক্ষা আইন পুনরায় চালু করেছে, যাতে দিনের সবচেয়ে গরম সময় কাজ বন্ধ রাখা যায়।

জার্মানিতেও তাপপ্রবাহের মধ্যে পানিতে ডুবে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

রাইন নদী থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্পেনে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশটির উত্তরাঞ্চলের শহর স্যান সেবাস্তিয়ানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্পেনের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, ২০০০ সালের পর দেশটিতে ১০ বার ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে, যেখানে তার আগের ২৫ বছরে এমন ঘটনা ঘটেছিল মাত্র দু’বার।

এদিকে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, চলমান চার দিনের তাপপ্রবাহে দেশের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে সাহারা মরুভূমি থেকে উত্তপ্ত বাতাস ইউরোপে প্রবেশ করছে। 

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু গবেষক ক্লেয়ার বার্নেসের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী এবং ভয়াবহ হয়ে উঠবে। ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতি সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।