জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য-সহ একাধিক দেশে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন:
আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এবং জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার একাধিক পুরনো রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে।
গত মে মাসেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রেকর্ড গড়া তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল। তার এক মাসের মধ্যেই আবারও চরম আবহাওয়ার কবলে পড়েছে মহাদেশটি। বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলেই এ ধরনের তীব্র তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন:
ফ্রান্সে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলকে ‘রেড অ্যালার্ট’-এর আওতায় আনা হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিসোস শহরে তাপমাত্রা ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। জনস্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলার কথা বিবেচনা করে রেড অ্যালার্ট জারি থাকা এলাকাগুলোতে মদ্যপান নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তীব্র গরমের কারণে প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর পিরামিডের নিচে আয়োজিত একটি বিনামূল্যের কনসার্টও বাতিল করা হয়েছে। তবে প্রচণ্ড গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতে নগর কর্তৃপক্ষ ক্যানেল সেন্ট মার্টিনে সাঁতার কাটার অনুমতি দিয়েছে।জার্মানিতেও তাপপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বজ্রঝড়ের আশঙ্কা। বার্লিন ওপেন টেনিস টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ নিরাপত্তার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর খেলা পুনরায় শুরু হয়। রাজধানী বার্লিনে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে পৌঁছেছে এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন:
বেলজিয়ামে তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই ৩০ ডিগ্রি অতিক্রম করেছে।
দেশটির আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড গড়তে পারে। প্রচণ্ড গরমের কারণে রেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় জাতীয় রেল সংস্থা এসএনসিবি কিছু ব্যস্ত সময়ের ট্রেন পরিষেবা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।আরও পড়ুন:
স্পেনে চলতি বছরের প্রথম আনুষ্ঠানিক তাপপ্রবাহ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে রাজধানী মাদ্রিদে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আয়োজিত বড় পর্দায় সরাসরি ম্যাচ দেখানোর অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। স্পেন ও প্রতিবেশী পর্তুগালের সমুদ্রসৈকতগুলোতে মানুষের ভিড় বাড়লেও প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠেছে।
আরও পড়ুন:
সুইজারল্যান্ডেও ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দেশটির নিম্নাঞ্চলগুলোতে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, এই তাপপ্রবাহ কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
আরও পড়ুন:
বলকান অঞ্চলের বিভিন্ন দেশেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও মন্টেনেগ্রোতে উচ্চ তাপমাত্রার জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জনগণকে পর্যাপ্ত পানি পান, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চরম তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকবে এবং দক্ষিণ ইংল্যান্ডে ‘ট্রপিক্যাল নাইটস’-এর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে রাতেও তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির নিচে নামবে না।
আরও পড়ুন:
রয়্যাল মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির প্রধান নির্বাহী লিজ বেন্টলি জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যে ৩৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা পৌঁছাতে পারে, যা জুন মাসের পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাবে। এতে টানা দুই মাসে দেশটির তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙার নজির সৃষ্টি হতে পারে।
আরও পড়ুন:
ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান গবেষক অক্ষয় দেওরাস সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপ এমন এক রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে, যার প্রভাব শুধু জনস্বাস্থ্যের ওপরই নয়, বরং বিদ্যুৎ, পরিবহন, অবকাঠামো এবং জরুরি পরিষেবার ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ভয়াবহ বাস্তবতা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু নীতিতে জোর দেওয়ার বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন তাঁরা।