পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: এসআইআর-এ পশ্চিমবঙ্গের ‘বিচারাধীন’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ২৭ লক্ষেরও বেশি ভোটারের মধ্যে ৭০.১৭ শতাংশ মুসলিম এবং ৫১ শতাংশ মহিলা। যাঁদের অধিকাংশকেই তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা যৌক্তিক অসংগতির কারণে চিহ্নিত করা হয়েছে। কলকাতার গবেষণা সংস্থা ‘সবর ইনস্টিটিউট’-এর একটি সমীক্ষায় সদ্য এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি উঠে এসেছে। এই ২৭ লক্ষ মানুষ ছাড়াও আরও প্রায় ৬৪ লক্ষ ভোটারের নাম সাপ্লিমেন্টারি বা অতিরিক্ত তালিকা থেকে বাদ গেছে। এএসডি অর্থাৎ অনুপস্থিত (অ্যাবসেন্ট), স্থানান্তরিত (শিফটেড), মৃত (ডেড) বা দ্বৈত (ডুপ্লিকেট) ভোটারের তকমা দিয়ে এঁদের নাম কাটা হয়েছে। বর্তমানে এই ৬৪ লক্ষ ভোটারের তথ্যও নতুন করে বিশ্লেষণের কাজ চলছে।


এই গোটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আনতে সবর ইনস্টিটিউট একটি উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার বা ওপেন ডেটাবেস প্রকাশে কাজ করছে। সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি এই ডেটাবেসে ধর্ম ও লিঙ্গ অনুযায়ী সমস্ত তথ্য সাজানো থাকবে। এর ফলে সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক এবং গবেষকরা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, এই নাম বাতিল প্রক্রিয়ার কোপ নির্দিষ্ট কোনও সম্প্রদায়ের উপর কীভাবে পড়েছে। এই তদন্ত জরুরি, কারণ ২৭ লক্ষেরও বেশি মানুষকে অত্যন্ত আপত্তিকর এবং অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ ডিলিট করা হয়েছে। যেমন, কোনও দম্পতির ৬ জন বা তার বেশি সন্তান থাকলে তাদের নাম বাদ পড়েছে। আবার বাবা-মায়ের নামের বানানে সামান্য অমিল থাকা, কিংবা বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরের কম হওয়ার মতো অদ্ভুত কারণ দেখিয়েও কেড়ে নেওয়া হয়েছে ভোটাধিকার।

পশ্চিমবঙ্গে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময় প্রথম ধাক্কায় প্রায় ৬১ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, মোট প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে গায়েব। নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল, মূলত মৃত, স্থানান্তরিত বা যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাদের নামই বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ছিল অন্যরকম। বহু প্রকৃত ও বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ায় তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ও হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে এসআইআর ট্রাইব্যুনাল গঠন করে কাজ শুরু হয়।

ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর বাতিল হওয়া ভোটারদের প্রায় ৩৪ লক্ষ আবেদন সেখানে জমা পড়ে। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠছে। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের আবেদন বিবেচনা করতে ঠিক কত দিন সময় লাগতে পারে, সে সম্পর্কে কারও কাছেই কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল যে, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেই বেছে বেছে ভোটারদের নাম বেশি কাটা হয়েছে। উপযুক্ত তথ্যের অভাবে কেউ প্রকাশ্যে এই নিয়ে জোরালো দাবি করতে পারছিলেন না। কিন্তু সবর ইনস্টিটিউটের এই রিপোর্ট সেই আশঙ্কাকেই সত্যি বলে ইঙ্গিত দিল। কারণ, বিচারাধীনদের মধ্যে ডিলিট হওয়া ৭০ শতাংশই হলেন মুসলিম ভোটার। সবচেয়ে বড় আক্ষেপের বিষয় হল, এই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য যখন ট্রাইব্যুনালে আটকে, ঠিক তখনই তাদের ভোটাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রেখেই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেল!