পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: তুরস্কের বাসিন্দা সুলতান কোসেন, যার উচ্চতা ৮ ফুট ২.৮ ইঞ্চি বা ২৫১ সেন্টিমিটার। তিনিই বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা জীবিত মানুষ। গিনেস ওয়ার্ল্ড রের্ডসের পাতায় টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি সবচেয়ে লম্বা মানুষের খেতাব ধরে রেখেছেন। তবে এই বিস্ময়কর রেকর্ডের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ লড়াই, সংগ্রাম এবং তীব্র প্রতিকূলতাকে জয় করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।

১৯৮২ সালের ১০ ডিসেম্বর তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আলিয়াগা নামের একটি কৃষক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সুলতান। তাঁর শৈশবটা কেটেছিল মা-বাবাকে কৃষিকাজে সাহায্য করেই। প্রথম দিকে তাঁর শারীরিক বৃদ্ধিতে কোনও অস্বাভাবিকতা ছিল না। ভাইবোনদের মতো তিনিও একেবারে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছিলেন।

কিন্তু তাঁর বয়স যখন ১০ বছর, তখন থেকেই এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাঁর উচ্চতা বাড়তে থাকে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সমবয়সিদের তুলনায় চোখে পড়ার মতো লম্বা হয়ে ওঠেন।

পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকেরা জানান, সুলতান মূলত 'জায়ান্টিজম' নামক এক বিরল রোগে আক্রান্ত। শরীরে অতিরিক্ত গ্রোথ হরমোন উৎপন্ন হওয়ার কারণেই এই সমস্যা দেখা দেয়। এর পাশাপাশি তাঁর শরীরে 'অ্যাক্রোমেগালি' নামের আরও একটি রোগ ধরা পড়ে, যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও মানুষের শারীরিক বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে পারে। ফলস্বরূপ, তাঁর উচ্চতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যা মানব ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, সমগ্র মানব ইতিহাসে মাত্র দশ জন মানুষের উচ্চতা ৮ ফুটের গণ্ডি পেরোতে পেরেছে।

উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুলতানের দৈনন্দিন জীবন রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।

নিজের মাপমতো পোশাক বা জুতো খুঁজে পাওয়া, কিংবা সাধারণ গাড়ি ও গণপরিবহনে যাতায়াত করা সাধারণ মানুষের কাছে যা অত্যন্ত স্বাভাবিক, সুলতানের কাছে তা এক একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি পরিবারকে সাহায্য করে গেছেন এবং নিজেকে এমন এক পৃথিবীর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন, যা মূলত তাঁর চেয়ে লম্বায় অনেক ছোট মানুষদের জন্যই তৈরি।

অবশেষে ২০০৯ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা জীবিত মানুষের স্বীকৃতি দেয়। শুধু তাই নয়, জীবিত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় হাতের রেকর্ডও তাঁর দখলে। তাঁর কবজি থেকে মধ্যমার ডগা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ২৮ সেন্টিমিটারেরও বেশি (প্রায় ১১ ইঞ্চি)। পাশাপাশি বহু বছর ধরে সবচেয়ে বড় পায়ের রেকর্ডও তিনিই ধরে রেখেছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের টানা পর্যবেক্ষণে শেষ পর্যন্ত তাঁর শরীরের অতিরিক্ত গ্রোথ হরমোন উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। সঠিক চিকিৎসার কারণেই তাঁর উচ্চতা বৃদ্ধি চিরতরে থেমে যায়, অন্যথায় তিনি হয়তো আরও লম্বা হতেন।

২০১৬ সালে একটি তথ্যচিত্র তৈরির সময় লন্ডনে তাঁর উচ্চতা পুনরায় নিখুঁতভাবে মাপা হয়। অনেকের মনেই তখন প্রশ্ন জেগেছিল, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সুলতান কি আজও তাঁর খেতাব ধরে রাখতে পেরেছেন? সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে চিকিৎসকদের মাপজোক ফের প্রমাণ করে দেয় যে, তিনিই এখনও বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা জীবিত মানুষ।
তবে সুলতানের জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি কেবল তাঁর রেকর্ড গড়া উচ্চতার পরিসংখ্যানে আটকে নেই। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা এবং নিত্যদিনের হাজারো বাধা অতিক্রম করেও তিনি যে ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রেখেছেন, তা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।

 তাঁর আন্তরিকতা, রসবোধ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছে। তুরস্কের এক ছোট গ্রাম থেকে উঠে এসে আজ তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং হাজারো মানুষকে অনুপ্রাণিত করছেন। ৮ ফুট ২.৮ ইঞ্চির সুলতান কোসেন প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, অন্যদের চেয়ে আলাদা হওয়াটাও জীবনে এক সময় সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।