ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলা পুনরায় শুরু না করে এবার দীর্ঘমেয়াদি নৌ-অবরোধের পথ বেছে নিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ট্রাম্প ইতোমধ্যে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ইরানের ওপর দীর্ঘস্থায়ী সামুদ্রিক অবরোধ কার্যকর রাখার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের বন্দরগুলোতে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতি, বিশেষ করে তেল রপ্তানি খাতের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করা। ওয়াশিংটনের ধারণা, সরাসরি যুদ্ধের তুলনায় অর্থনৈতিক ও নৌ-অবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনা আরও কার্যকর হতে পারে।

মার্কিন প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের মতে, সামরিক অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ এবং তা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। তাই তারা এমন একটি কৌশল নিয়েছে, যা ইরানের অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করবে, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করবে না।

বিশেষ করে ইরানের জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করা গেলে দেশটির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে বড় আঘাত হানা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার কঠোর অবস্থান থেকে এখনও একচুলও সরেনি। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে অন্তত ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসন এই শর্ত শিথিল করার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান স্পষ্ট— তেহরান বড় ধরনের ছাড় না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের ওপর আরোপিত এই অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক চাপ বজায় থাকবে। অর্থাৎ, কোনো দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর বদলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ আরোপের কৌশল নিয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তেহরানের কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন শর্তের জবাবে তারা একটি সংশোধিত প্রস্তাব দেওয়ার কথা ভাবছে, তবে তার আগে দেশটির উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে আরও আলোচনা প্রয়োজন। জানা গেছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরান নতুন করে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ পরিকল্পনা সেই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে তিনি ইরানের সঙ্গে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী নন। বরং অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তেহরানকে কৌশলগতভাবে দুর্বল করে তোলাই এখন তার অগ্রাধিকার।

এই দীর্ঘমেয়াদি নৌ-অবরোধ পরিকল্পনা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই প্রভাব ফেলবে না, বরং এর প্রভাব পড়তে পারে গোটা বিশ্ববাজারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়। যদি ওই অঞ্চলে অবরোধ ও উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হয়, তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তেলের দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং সাধারণ ভোক্তার ওপর। ফলে ইরানকে চাপের মুখে ফেলতে গিয়ে বিশ্ববাজারেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।