পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আর কোনো সামরিক হামলা চালানো হবে না-এমন ‘বিশ্বাসযোগ্য গ্যারান্টি’ দাবি করেছে ইরান। দেশটির মতে, এই নিশ্চয়তা ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে এই অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সাইদ ইরাভানি।

ইরাভানি বলেন,
“পারস্য উপসাগর ও বৃহত্তর অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা তখনই সম্ভব, যখন ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের আগ্রাসন স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে।”

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং ইরানের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রতি পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা গ্যারান্টি দিতে হবে। অন্যথায় অঞ্চলটির সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক নৌপথ ঝুঁকির মুখে থেকেই যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই অবস্থান মূলত হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং জ্বালানি বাজারে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখার কূটনৈতিক বার্তা। কারণ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, এবং সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অবস্থানরত ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেছেন, ওয়াশিংটনের ‘অতিরিক্ত দাবি’র কারণেই শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে। তাঁর দাবি, আলোচনা যথেষ্ট অগ্রসর হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অনমনীয় অবস্থানের কারণে কাঙ্ক্ষিত সমাধানে পৌঁছানো যায়নি।

আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবসম্মত সমঝোতার পরিবর্তে এমন শর্ত আরোপ করতে চেয়েছে, যা ইরানের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ করে। ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ নষ্ট হয়েছে।

এই সফরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আরাগচিকে আশ্বস্ত করেছেন যে, যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমনে রাশিয়া “তেহরানের পাশে থাকবে” এবং কূটনৈতিক সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
মস্কোর এই সমর্থন ইরানের জন্য বড় কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের মুখে রাশিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন তেহরানের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন,
“ইরান যদি আলোচনা করতে চায়, তারা আমাদের ফোন করতে পারে।”

তিনি আরও জানান, গত সপ্তাহান্তে পাকিস্তানে প্রতিনিধি না পাঠানোর ঘটনাকে তিনি শত্রুতার নতুন সংকেত হিসেবে দেখছেন না। তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যে কোনো নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন একদিকে আলোচনার দরজা খোলা রাখার কথা বললেও অন্যদিকে কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে। এই দ্বৈত কৌশলের কারণেই কূটনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে লেবানন সীমান্তেও নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যুদ্ধবিরতি বহাল থাকলেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, হিজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হামলা ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে, এবং এই হুমকি মোকাবিলায় সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে।

তবে লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন, যদিও যুদ্ধবিরতির কারণে পরিস্থিতি শান্ত থাকার কথা ছিল। এই হামলার ফলে সীমান্তে আবারও অস্থিরতা বেড়েছে।