ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে কিংবদন্তি মিডফিল্ডারের অভাব নেই। স্যার ববি চার্লটন, পল গ্যাসকোয়েন, স্টিভেন জেরার্ড, ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড কিংবা ডেভিড বেকহ্যাম—প্রত্যেকেই নিজেদের সময়ে ইংলিশ ফুটবলে অমর হয়ে আছেন। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে জুড বেলিংহাম যেভাবে নিজেকে মেলে ধরেছেন, তাতে নতুন এক স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে ইংল্যান্ড। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই তিনি হয়ে উঠেছেন থ্রি লায়ন্সদের সবচেয়ে বড় ভরসা।
স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার বিশ্বকাপের শুরু থেকেই আছেন দুর্দান্ত ছন্দে। গ্রুপ পর্বে দুটি গোল করে ইংল্যান্ডকে নকআউটে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন। এরপর শেষ ষোলোতে সহ-আয়োজক মেক্সিকোর বিপক্ষে ৩-২ গোলের রুদ্ধশ্বাস জয়ে করেন জোড়া গোল। কোয়ার্টার ফাইনালেও থামেননি তিনি। নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে আবারও দুটি গোল করে একাই দলকে তুলে দেন সেমিফাইনালে।
এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ছয় ম্যাচে ছয় গোল করেছেন বেলিংহাম। শুধু ঘানা ও ডি আর কঙ্গোর বিপক্ষে গোল না পেলেও দুই ম্যাচেই ছিলেন দলের অন্যতম সেরা পারফর্মার।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, টুর্নামেন্ট যত এগোচ্ছে, ততই ভয়ংকর হয়ে উঠছেন এই তরুণ মিডফিল্ডার।
ছয় গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসি এবং ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন তিনি। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে বেলিংহামের লক্ষ্য একটাই—৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইংল্যান্ডকে আবার বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দেওয়া।
অবশ্য ইংল্যান্ড শুধু একজনের ওপর নির্ভরশীল নয়। সামনে হ্যারি কেইনের নেতৃত্ব, উইংয়ে বুকায়ো সাকার গতি, রক্ষণে অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল গড়ে তুলেছেন কোচ টমাস টুখেল। কিন্তু বড় ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার মতো যে খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হয়, সেই ভূমিকাতেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বেলিংহাম।
এখন ইংল্যান্ডের সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন দলটি অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস এবং বড় ম্যাচের মানসিকতায় এগিয়ে থাকলেও ইংলিশ শিবিরে আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই।
ম্যাচের আগে বেলিংহাম বলেছেন, ‘আমি শুধু নিজের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করতে চাই। দলের জয়ে অবদান রাখতে পারলেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই।
ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান নয়, আমার লক্ষ্য ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ জেতানো। যদি আমরা ট্রফি জিততে পারি, সেটাই হবে আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন।’
ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলের মতে, বেলিংহাম এখন আর শুধু প্রতিভাবান তরুণ নন, তিনি দলের অন্যতম নেতা।
‘জুড এমন একজন ফুটবলার, যে কঠিন মুহূর্তে দায়িত্ব নিতে ভয় পায় না। ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস আমাদের দলের জন্য অমূল্য,’—বলেছেন টুখেল।
অধিনায়ক হ্যারি কেইনের ভাষায়, ‘বিশ্বের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন এখন জুড। সে শুধু গোল করছে না, পুরো দলকে আরও ভালো খেলতে সাহায্য করছে। ওর উপস্থিতি দলের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দেয়।’
সতীর্থ বুকায়ো সাকা বলেন, ‘অনুশীলনেও জুড একই রকম ক্ষুধার্ত থাকে। ম্যাচে যা করছে, তা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। প্রতিদিন নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করে সে।

ডিফেন্ডার জন স্টোনসের মতে, ‘জুডের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, বড় ম্যাচে সে কখনো চাপ অনুভব করে না। যত বড় মঞ্চ, তত বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলে।’
প্রতিপক্ষরাও বেলিংহামের প্রশংসায় মুগ্ধ। নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাকেন বলেন, ‘আমরা ওকে থামানোর পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু বেলিংহাম এমন একজন ফুটবলার, যাকে ৯০ মিনিট নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব। সামান্য একটি সুযোগ পেলেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়।’
নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডও বলেন, ‘জুড অসাধারণ খেলছে। বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হওয়ার পথে সে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।’
এখন ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা আরেকটি মহারণের-বেলিংহাম বনাম মেসি। একদিকে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল তরুণ তারকা, অন্যদিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। একজন নিজের উত্তরাধিকার আরও সমৃদ্ধ করতে চান, অন্যজন ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখতে চান।

ইংল্যান্ডের কোটি সমর্থকের বিশ্বাস, সেমিফাইনালেও যদি বেলিংহাম নিজের জাদু দেখাতে পারেন, তাহলে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আরও এক ধাপ বাস্তবের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। আর যদি সেই জয় আসে আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে, তাহলে ২০২৬ বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডের জন্য যেমন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তেমনি জুড বেলিংহামের ক্যারিয়ারেও হয়ে উঠবে এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।