জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে সাধারণ পরিষদে শেষবারের মতো ভাষণ দিতে গিয়ে যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, জলবায়ু সংকট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার নিয়ে বিশ্বনেতাদের সতর্ক করলেন অ্যান্তনিও গুতেরেস। তাঁর ভাষায়, বিশ্বের বিভিন্ন সংকট আলাদা নয়—এসব একই বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের সূচনায় বক্তব্য দেন গুতেরেস। ৩১ ডিসেম্বর তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হবে। ফলে এই ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রায় এক দশকের জাতিসংঘ নেতৃত্বের শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেন তিনি।

এআইয়ের দ্রুত বিকাশ নিয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করেন গুতেরেস।

তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর তৈরি সুরক্ষা কাঠামো প্রয়োজন। এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে স্বাধীন তদারকি এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ওপরও জোর দেন তিনি। জীবন-মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কখনও যন্ত্রের হাতে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া উচিত নয় বলেও সতর্ক করেন জাতিসংঘের মহাসচিব।

গুতেরেস বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারগুলোর পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞানী, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও অন্যান্য অংশীজনকেও এআই নিয়ে আলোচনায় যুক্ত করতে হবে। এআইকে ঘিরে প্রতিযোগিতা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।

যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রসঙ্গেও কঠোর বার্তা দেন বিদায়ী মহাসচিব।

গত এক দশকে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষার কথা তুলে ধরেন তিনি। চলমান সংঘাত বন্ধ করে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান বিশ্বনেতাদের।

জলবায়ু সংকটকে আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা হিসেবে উল্লেখ করেন গুতেরেস। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দূষণকারীদের দায়বদ্ধ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বুধবার নিউইয়র্কে বিশেষ জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতিসংঘের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন গুতেরেস।

তাঁর মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও অনেকাংশে অতীতের ক্ষমতার কাঠামোকে প্রতিফলিত করে। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোতে সংস্কার এবং আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি তিনি আবারও সামনে আনেন।

নিজের শেষ ভাষণে বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের পাশাপাশি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট নিয়েও সতর্ক করেন গুতেরেস। তাঁর মতে, বিশ্ব এখন গভীর বিভাজনের দিকে এগোচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আইন, সহযোগিতা ও জাতিসংঘ সনদের মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।

শেষ পর্যায়ে গত এক দশকে পাশে থাকা বিশ্বনেতা ও জাতিসংঘের কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান গুতেরেস। মহাসচিবের দায়িত্ব শেষ হলেও শান্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জাতিসংঘ সনদের মূল মূল্যবোধের পক্ষে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি।