বাবার মৃত্যুর সময় মেয়ে বিবাহিত ছিলেন, কিন্তু পরে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে—শুধু এই কারণে তাঁকে পারিবারিক পেনশন থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এমনটাই জানাল ত্রিপুরা হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, প্রযোজ্য পেনশন বিধিতে এমন কোনও শর্ত নেই যে পেনশনভোগী বাবার জীবদ্দশাতেই মেয়ের বিবাহবিচ্ছেদ হতে হবে।

এই মামলার সূত্রপাত আগরতলা পুরনিগমের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর মেয়ে উজ্জ্বলা রানি পালের পারিবারিক পেনশনের দাবি ঘিরে। মামলাটির শুনানি হয় প্রধান বিচারপতি এম এস রামচন্দ্র রাও এবং বিচারপতি বিশ্বজিৎ পালিতের ডিভিশন বেঞ্চে।

আগরতলা পুরনিগমের ওই কর্মী ২০০৪ সালে অবসর নেন। ২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর স্ত্রী তার আগেই মারা গিয়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর সময় উজ্জ্বলা বিবাহিত ছিলেন। পরে ২০২১ সালের ৪ অক্টোবর স্বামীর সঙ্গে পারস্পরিক সম্মতিতে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাবার প্রাপ্য পারিবারিক পেনশনের জন্য আবেদন করেন উজ্জ্বলা। কিন্তু তাঁর আবেদন খারিজ করে দেয় আগরতলা পুরনিগম। পুরনিগমের দাবি ছিল, ২০১৮ সালে অর্থ দফতরের যে নির্দেশিকায় বিবাহবিচ্ছিন্ন মেয়েদের পারিবারিক পেনশনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল, তা পুরনিগম গ্রহণ করেনি।

এরপর বিষয়টি হাইকোর্টে গড়ায়।

একক বেঞ্চেও উজ্জ্বলার আবেদন খারিজ হয়েছিল। সেই রায়ের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হন তিনি।

ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, ২০১৭ সালের ত্রিপুরা স্টেট সিভিল সার্ভিসেস (রিভাইজড পেনশন) রুলসের ৮ নম্বর নিয়মে কোথাও বলা নেই যে পেনশনভোগী বাবার জীবদ্দশাতেই মেয়ের বিবাহবিচ্ছেদ হতে হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, একক বেঞ্চ নিয়মটির মধ্যে এমন একটি অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত করেছিল, যা আসলে প্রযোজ্য বিধিতে নেই।

হাইকোর্ট আরও উল্লেখ করে, আগরতলা পুরনিগম নিজেই স্বীকার করেছিল যে আইনত বিবাহবিচ্ছিন্ন কোনও মহিলা নির্দিষ্ট আয়সীমার মধ্যে থাকলে পারিবারিক পেনশনের দাবিদার হতে পারেন। ফলে বাবার মৃত্যুর পরে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে—শুধুমাত্র এই কারণে তাঁকে পেনশন থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

পুরনিগমের অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত আরও বলে, সামান্য পরিমাণ পারিবারিক পেনশন পাওয়ার জন্য কোনও মহিলা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ তুলে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করবেন এবং নিজের সংসার ভেঙে ফেলবেন—এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন।

উজ্জ্বলার স্বামীও বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনে তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করেননি। তাই শুধুমাত্র পেনশন পাওয়ার উদ্দেশ্যে বিবাহবিচ্ছেদ করা হয়েছিল, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না বলে জানায় আদালত।

রায়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ২০১৭ সালের ১৯ জুলাইয়ের একটি অফিস মেমোর‌্যান্ডামের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে এমন পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করা হয়েছিল, যেখানে পেনশনভোগীর জীবদ্দশায় বিবাহবিচ্ছেদের মামলা শুরু হলেও তাঁর মৃত্যুর পরে সেই বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়েছে। প্রয়োজনীয় অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে বিবাহবিচ্ছেদের তারিখ থেকে পারিবারিক পেনশন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও ওই নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত উজ্জ্বলা রানি পালের আবেদন মঞ্জুর করে ত্রিপুরা হাইকোর্ট। একক বেঞ্চের আগের রায় খারিজ করে ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দেয়, ২০২১ সালের ৪ অক্টোবর তাঁর বিবাহবিচ্ছেদের তারিখ থেকে পারিবারিক পেনশন দিতে হবে। পাশাপাশি তাঁর সমস্ত বকেয়া পেনশনও মিটিয়ে দিতে হবে। বকেয়া অর্থের উপর বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে সুদ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।