জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার ইঙ্গিত। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার বিরুদ্ধে তাঁরই দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের অন্তত ২৪ জন বিধায়ক বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে সূত্রের খবর। মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক রদবদল, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা এবং মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ থেকেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিদ্রোহী বিধায়কদের দাবি পূরণ না হলে দলের অন্দরে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, শেষ পর্যন্ত কি বিপাকে পড়তে চলেছে ওমর আবদুল্লার সরকার?

সূত্রের খবর, বিদ্রোহী বিধায়কদের প্রধান অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা নাসির আসলাম ওয়ানিকে ঘিরে। তাঁদের অভিযোগ, দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ওয়ানি অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করছেন। তাঁর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করছেন না বলে অভিযোগ বিদ্রোহীদের। পাশাপাশি, সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় যে রদবদল করা হয়েছে, তা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে তাঁদের একাংশের। কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে বলে জানা যাচ্ছে।

এই অসন্তোষের জেরেই শুক্রবার শ্রীনগরে ন্যাশনাল কনফারেন্সের বিধায়ক কাইজার জামশিদ লোনের বাড়িতে বৈঠকে বসেন ১৮ জন বিধায়ক। ভিডিও কলের মাধ্যমে আরও ছয়জন যোগ দেন বলে সূত্রের দাবি। সব মিলিয়ে ২৪ জন বিধায়কের এই তৎপরতা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। যদিও তাঁরা দল ছাড়ার কথা সরাসরি বলেননি। বরং তাঁদের বক্তব্য, দলের বিরুদ্ধে নয়, দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতেই তাঁরা সরব হয়েছেন।

মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভার রদবদলকে কেন্দ্র করেই অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে বলে খবর। বিদ্রোহীদের অভিযোগ, মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব এবং ধর্মীয় ভারসাম্যের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। তাঁদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা নাসির আসলাম ওয়ানির প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালের পর এই প্রথম জম্মু বিভাগের ১০টি জেলার মধ্যে আটটি জেলা থেকে কোনও মন্ত্রী নেই। জম্মু ও শ্রীনগর—দুই অঞ্চলই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও মন্ত্রিসভায় জম্মু অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, শ্রীনগর থেকে দু’জন মন্ত্রী থাকায় আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ধর্মীয় প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। বর্তমান মন্ত্রিসভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের একমাত্র মন্ত্রী সুরেন্দ্র চৌধুরীকে নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে বলে সূত্রের খবর। বিদ্রোহী বিধায়কদের একাংশ তাঁর অপসারণের দাবিও তুলেছেন বলে জানা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে মন্ত্রিসভার গঠন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে দলের অভ্যন্তরে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে।

২০২৪ সালের জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভা নির্বাচনে ন্যাশনাল কনফারেন্স উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল। ৯০ আসনের বিধানসভায় দলটি ৪১টি আসনে জয়ী হয়। কংগ্রেস পায় ছয়টি আসন, পিডিপি চারটি এবং বিজেপি ২৯টি আসন দখল করে। কয়েকটি ছোট দল ও নির্দল প্রার্থীরাও জয়ী হন।

নির্বাচনের পর ন্যাশনাল কনফারেন্স ও কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠিত হয়।

তবে কংগ্রেস সরকারে সরাসরি যোগ না দিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে সরকারের রাজনৈতিক সমীকরণে ন্যাশনাল কনফারেন্সের নিজস্ব বিধায়কসংখ্যাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে দলের ২৪ জন বিধায়ক একযোগে বিরোধিতা করলে ওমর আবদুল্লার নেতৃত্বের উপর চাপ বাড়তে পারে। তবে শুধু অসন্তোষ প্রকাশ বা বৈঠকে অংশ নেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁরা সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেছেন। সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে কি না, তা নির্ভর করবে তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং বিধানসভায় তাঁদের অবস্থানের উপর।

বর্তমানে ন্যাশনাল কনফারেন্সের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ কতটা গভীর, তা স্পষ্ট নয়। বিদ্রোহী বিধায়কদের দাবি মেনে মন্ত্রিসভায় ফের রদবদল করা হবে কি না, কিংবা উপদেষ্টা নাসির আসলাম ওয়ানির ভূমিকা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কোনও পদক্ষেপ করবেন কি না, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

তবে ২৪ জন বিধায়কের একজোট হওয়ার খবর সত্যি হলে তা ওমর আবদুল্লার জন্য নিঃসন্দেহে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। দলের অন্দরের ক্ষোভ দ্রুত প্রশমিত করতে না পারলে সরকার পরিচালনা থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ- সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে। এখন দেখার, আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন কি না জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী, নাকি এই অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নেয়।