যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে ইরান। বিদেশি কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে চলছে এই আমদানি। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে ওঠা একটি গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ২০০ কোটি ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক তৈরির উপাদান ও ভারী ট্রাক আমদানি করেছে দেশটি। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন:
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরান বিপুল সংখ্যায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে। এত অস্ত্র ব্যবহারের পরও কীভাবে দেশটি নিজেদের অস্ত্রভান্ডার পুনরায় পূরণ করছে, তা খতিয়ে দেখতেই এই অনুসন্ধান চালানো হয়। তাতে উঠে এসেছে, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহের জন্য ইরান একটি জটিল বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ।
আরও পড়ুন:
অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, এই নেটওয়ার্কের একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামের শুরুতে রয়েছে ‘এমওডি’। প্রতিষ্ঠানগুলির ঠিকানা হিসেবে তেহরানে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে প্রতিষ্ঠার তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি।
তবে করপোরেট নথি অনুযায়ী, এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানই বাস্তবে ২০১৩ সালে গড়ে উঠেছে।আরও পড়ুন:
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বোনিয়াদের যোগসূত্র রয়েছে। বিদেশি সংস্থা ও মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে তেল বিক্রির অর্থ সামরিক সরঞ্জাম কেনার কাজে লাগানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন:
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা আমদানি চালানের প্রায় ৯৭ শতাংশের মূল্য পরিশোধে সরাসরি মুদ্রা লেনদেনের প্রয়োজন হয়নি। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রচলিত পথে অর্থ না পাঠিয়েই অধিকাংশ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা আর্থিক লেনদেনের ওপর নজরদারি এড়ানো সহজ হয়েছে বলে মনে করছেন অনুসন্ধানকারীরা।
আরও পড়ুন:
প্রতিবেদনে ‘এমওডি ৩৪৬৪২৮’ নামে চিহ্নিত একটি প্রতিষ্ঠানকে এই নেটওয়ার্কের অন্যতম বড় আমদানিকারক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ কিনেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ভারতীয় মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন:
আমদানি করা পণ্যের মধ্যে ছিল রকেটের জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক উপাদান, বিস্ফোরক এবং অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে চীন থেকে ৮৮৬ টন রাসায়নিক পদার্থ আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। এসব উপাদানের মধ্যে সোডিয়াম ক্লোরেট ও পারক্লোরেট ছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট তৈরিতে এ ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা যায়।আরও পড়ুন:
প্রতিবেদনে সূত্রের বরাতে আরও দাবি করা হয়েছে, এই রাসায়নিকের একটি চালানের সঙ্গে ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল ইরানের শহিদ রাজায়ি বন্দরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণের যোগসূত্র ছিল। ওই বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২০০-র বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। তবে এই যোগসূত্রের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
আরও পড়ুন:
সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য যানবাহন আমদানির ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ৪৩৫টি আইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে। এ ধরনের ভারী ট্রাককে পরিবর্তন করে ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এ ছাড়াও হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার পিকআপ আমদানি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব গাড়িতে ভারী মেশিনগান বসিয়ে সামরিক কাজে ব্যবহার করতে পারে আইআরজিসি।আরও পড়ুন:
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও ইরানে সামরিক সরঞ্জাম তৈরির উপযোগী বিভিন্ন উপাদান পৌঁছেছে। এই সময়ে চীন থেকে ৯৩ টন টাইটানিয়াম, ২৬৮ টন নাইট্রোসেলুলোজ এবং আরও ২৭৬ টন রাসায়নিক পদার্থ আমদানি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। টাইটানিয়াম ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো তৈরিতে এবং নাইট্রোসেলুলোজ ও অন্যান্য রাসায়নিক নির্দিষ্ট ধরনের জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আরও পড়ুন:
এ ছাড়া রাশিয়া থেকে প্রায় ৭৬ লাখ ডলারের বিস্ফোরক সক্রিয় করার যন্ত্র পাঁচটি চালানে ইরানে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৯৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। সর্বশেষ চালানটি জুনে পৌঁছেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে ইরান। পাশাপাশি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কাঠামো তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য আধুনিক যন্ত্রপাতিও সংগ্রহ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
সব মিলিয়ে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক সংঘাতের মধ্যেও ইরানের অস্ত্র উৎপাদন এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রক্রিয়া কীভাবে সচল রয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের এই অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক, মধ্যস্থতাকারী এবং বিকল্প অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এড়ানোর চেষ্টা করছে তেহরান। তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।