নির্বাচনী প্রচারের উত্তপ্ত আবহেও মানবিকতার এক উজ্জ্বল নজির গড়লেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের মাঝেও অসুস্থ এক মহিলা সমর্থকের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি দেখালেন সহমর্মিতার অনন্য দৃষ্টান্ত। শুধু খোঁজখবরই নেননি, নিজের গাড়িতে করেই ওই মহিলাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার বেহালার নির্বাচনী প্রচারে এই ঘটনাই মুহূর্তে সাড়া ফেলে দেয় জনতার মধ্যে।

দ্বিতীয় দফার বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শনিবার বেহালা পশ্চিম কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থনে প্রচারে নেমেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচারসভা তখন পুরোদমে চলছে। মঞ্চ থেকে বিজেপিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময় জনতার ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এক মহিলা সমর্থক। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নজরে আসে মুখ্যমন্ত্রীর।

বক্তব্য থামিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওই মহিলার খোঁজ নেন মমতা। তিনি নিজে এগিয়ে গিয়ে অসুস্থ সমর্থকের নাড়ি পরীক্ষা করেন এবং প্রাথমিকভাবে বুঝতে পারেন যে, তাঁর রক্তচাপ কমে গিয়েছে। উপস্থিত কর্মীদের দ্রুত জল দেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি, দ্রুত চিকিৎসার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।

মঞ্চে দাঁড়িয়েই মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“আমার গাড়িটা ওঁকে দিচ্ছি। ওই গাড়িতে করে দ্রুত ওঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হোক। ওনাকে না নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমি বক্তব্য শুরু করব না।”

মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশের পরই দ্রুত তাঁকে মমতার গাড়িতে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। অসুস্থ সমর্থককে নিরাপদে পাঠানোর পরেই আবার নিজের বক্তব্য শুরু করেন তিনি।

এই ঘটনার পর সভামঞ্চে উপস্থিত তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আবেগের সঞ্চার হয়। রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেও নেত্রীর এই মানবিক আচরণ উপস্থিত জনতার মন ছুঁয়ে যায়। অনেকেই বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আচরণ প্রমাণ করে, তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, মানুষের বিপদে পাশে থাকা একজন সংবেদনশীল মানুষও।

অন্যদিকে, একই দিনে ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়ায় আরেকটি নির্বাচনী সভায় গিয়ে সমস্যার মুখে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী। স্বামী নারায়ণ মন্দির সংলগ্ন এলাকায় তাঁর সভা চলাকালীন বিজেপির তরফে উচ্চস্বরে মাইক বাজানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। তৃণমূলের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর সভার ঠিক সামনেই বিজেপি জোরে মাইক বাজিয়ে সভা ব্যাহত করার চেষ্টা করে।

এই পরিস্থিতিতে বিরক্ত হয়ে মমতা 
বন্দ্যোপাধ্যায় সভামঞ্চ থেকেই বলেন,
“এভাবে মিটিং করা সম্ভব নয়। আমায় ক্ষমা করবেন। এর প্রতিবাদে আমায় ভোটটা দেবেন।

এরপর তিনি সভা অসমাপ্ত রেখেই সেখান থেকে বেরিয়ে যান। ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। তৃণমূলের অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবেই সভা পণ্ড করার চেষ্টা করেছে বিজেপি। যদিও এ বিষয়ে বিজেপির তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

একদিকে রাজনৈতিক সংঘাত, অন্যদিকে মানবিক আচরণ— শনিবারের প্রচারে এই দুই বিপরীত ছবিই উঠে এল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মসূচিতে। তবে দিনের শেষে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে অসুস্থ সমর্থকের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর মানবিক উদ্যোগ। ভোটের প্রচারের ব্যস্ততার মাঝেও একজন সাধারণ মানুষের শারীরিক অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের গাড়ি হাসপাতালে পাঠানো নিঃসন্দেহে নেত্রীর সহানুভূতিশীল মানসিকতারই পরিচয় বহন করে।

নির্বাচনের উত্তেজনাপূর্ণ আবহে এই ঘটনা ভোটারদের মনেও আলাদা ছাপ ফেলেছে। রাজনৈতিক ভাষণের বাইরে বেরিয়ে এমন মানবিক মুহূর্তই অনেক সময় নেতাদের সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। শনিবার বেহালার সভায় সেই ছবিই স্পষ্টভাবে ধরা পড়ল।