নাম বাতিলের তালিকা প্রকাশ্যে যত আসছে ততই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে নদিয়া জেলার বিভিন্ন প্রান্তে। সেই ভয় ছেলে-মেয়ে, সংসার ছেড়ে দেশ থেকে চলে যাওয়ার ভয়। ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার ভয়। আর এই ভয় থেকে মুক্তির পথ জানা নেই কারও । নির্বাচন কমিশন বলছে, চাইলে ট্রাইবুনাল কোর্টে যেতে পারবেন নাম বাদ যাওয়া ব্যক্তিরা। তার চেয়েও যে প্রশ্নটা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তা হল ট্রাইবুনাল কোর্টেও যদি অযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়?
রানাঘাট পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোঃ আব্দুল কাইউম বিশ্বাসের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। ২০০২ সালের তালিকায় মোঃ আব্দুল কাইউম বিশ্বাসের নাম ভুল করে লেখা হয়েছিল 'কাইউম বিশ্বাস'। লিখেছিলেন নির্বাচন কমিশনের  কর্মীরা। পরবর্তীতে সংশোধন করে নিয়ে আবার মোঃ আব্দুল কাইউম বিশ্বাস করেন। আর সেই ভুল সংশোধন করাটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবনে। প্রথমে বিবেচনাধীন ভোটারের তালিকায় ঠাঁই,  তারপরে দ্বিতীয় অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করে  তার  নামটাই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি রানাঘাট ফকির মোঃ হাই মাদ্রাসায় দীর্ঘ ৩৪ বছর শিক্ষকতা করেছেন।

এখন পেনশন পাচ্ছেন। 'সমস্ত নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও  আমার নাম বাদ গেছে। আমার নথি দেখেই আমার ছেলেরা যোগ্য ভোটার। আর আমি হলাম অযোগ্য ভোটার। আমার পাসপোর্ট, মাধ্যমিকের শংসাপত্র সব দেখিয়েও এই অবস্থা।' বলেন তিনি।
শুধু আব্দুল কাইউম বিশ্বাস নন, নদিয়া জেলার প্রায় পাঁচটি ব্লকে হাজার হাজার মানুষের নাম বাদ গেছে। চাপড়া পাথুরিয়া গ্রামের ৬৫ নম্বর পার্টে ২৮ জনের নাম বিবেচনাধীন ছিল। তাদের সকলের নামই বাদ গেছে। সেই তালিকায় আছেন স্বয়ং বিএলও সাইফুল ইসলাম শেখ। তিনি বলেন যাদের নাম বাদ গিয়েছে তারা আমার কাছে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ জানতে চাইছেন। আমি তো নিজেই সেই পথের সন্ধান করছি দিশেহারা লাগছে। চাপড়া বিধানসভার হাটরা গ্রামে বাদ গেছে ৯৯৫ জনের নাম।
এই গ্রামে ছয়টি বুথ আছে। ওই গ্রামেরই ৫৬ নম্বর পার্ট এ ২৬৫ জনের মধ্যে ২৫০ জনেরই নাম বাদ গিয়েছে।
৩০ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন আজিজুল হক বিশ্বাস। ভোটের কাজও করছেন সমান তালে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে  প্রিসাইডিং অফিসারের  দায়িত্ব পড়েছে তাঁর কাঁধে। শুক্রবার ভোটের ট্রেনিংও নিয়েছিলেন। কিন্তু রাতে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট  প্রকাশের পরে দেখা যায়, আজিজুলের নাম বাদ। নদিয়ার  কৃষ্ণনগরের এই ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দিকে আঙুল তুলেছেন আজিজুল।আজিজুল হক বিশ্বাস কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক। ২০০২-এর ভোটার লিস্টে তাঁর নাম ছিল। তবে গত কয়েক বছর তিনি পদবি থেকে ‘বিশ্বাস’ বাদ দিয়েছেন। শুধু লেখেন, ‘আজিজুল হক’।
সার  শুরুর পরে এতেই বিপত্তি বাঁধে বলে দাবি তাঁর।‘হক’ আর ‘বিশ্বাসের’ টানাপড়েনে শুনানিতে ডাক পড়ে আজিজুলের। তাঁর অভিযোগ, ‘নির্বাচন কমিশন নথি যাচাইয়ের জন্য ১৩টি প্রমাণপত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমি সব ক’টাই দেখিয়েছি। কিন্তু তার পরেও দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট থেকে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।’
গত ৩০ বছর ধরে ভোটের কাজ করছেন। এ বারও প্রিসাইডিং অফিসারের ট্রেনিং নিয়েছেন। কিন্তু তালিকায় নাম না থাকায় সবই বৃথা হয়ে গেল দাবি করে আজিজুলের প্রশ্ন, ‘আমি নিজেই যদি ভোটার না হই, তা হলে বুথ সামলাব কী ভাবে?’ভোটার তালিকায় প্রিসাইডিং অফিসারের নাম বাদ পড়ার ঘটনায় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক টানাপড়েন। কমিশন ও বিজেপির দিকে আঙুল তুলেছেন কৃষ্ণনগর ব্লক তৃণমূলের সভাপতি সৌমাল্য ঘোষ। তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত ভাবে করা হয়েছে। এ ভাবে অনেকেরই নাম বাদ দিয়েছে। আসলে সার -এর নামে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার।’