বিতর্কিত নির্বাচনী সংশোধনের ফলে সৃষ্ট ক্ষত আরও গভীর হচ্ছে।
বাংলার জন্য এসআইআর-পরবর্তী চতুর্থ অতিরিক্ত / সম্পূরক তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সূত্র জানায়, এতে প্রায় ১২ লক্ষ নাম ছিল, যার মধ্যে ৪০ শতাংশকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
রানাঘাট পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোঃ আব্দুল কাইউম বিশ্বাসের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। ২০০২ সালের তালিকায় মোঃ আব্দুল কাইউম বিশ্বাসের নাম ভুল করে লেখা হয়েছিল 'কাইউম বিশ্বাস'। লিখেছিলেন নির্বাচন কমিশনের  কর্মীরা। পরবর্তীতে সংশোধন করে নিয়ে আবার মোঃ আব্দুল কাইউম বিশ্বাস করেন। আর সেই ভুল সংশোধন করাটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবনে। প্রথমে বিবেচনাধীন ভোটারের তালিকায় ঠাঁই,  তারপরে দ্বিতীয় অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করে  তার  নামটাই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি রানাঘাট ফকির মোঃ হাই মাদ্রাসায় দীর্ঘ ৩৪ বছর শিক্ষকতা করেছেন। এখন পেনশন পাচ্ছেন। 'সমস্ত নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও  আমার নাম বাদ গেছে। আমার নথি দেখেই আমার ছেলেরা যোগ্য ভোটার।

আর আমি হলাম অযোগ্য ভোটার। আমার পাসপোর্ট, মাধ্যমিকের শংসাপত্র সব দেখিয়েও এই অবস্থা।' বলেন তিনি।
শুধু আব্দুল কাইউম বিশ্বাস নন, নদিয়া জেলার প্রায় পাঁচটি ব্লকে হাজার হাজার মানুষের নাম বাদ গেছে। চাপড়া পাথুরিয়া গ্রামের ৬৫ নম্বর পার্টে ২৮ জনের নাম বিবেচনাধীন ছিল। তাদের সকলের নামই বাদ গেছে। সেই তালিকায় আছেন স্বয়ং বিএলও সাইফুল ইসলাম শেখ। তিনি বলেন যাদের নাম বাদ গিয়েছে তারা আমার কাছে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ জানতে চাইছেন। আমি তো নিজেই সেই পথের সন্ধান করছি দিশেহারা লাগছে। চাপড়া বিধানসভার হাটরা গ্রামে বাদ গেছে ৯৯৫ জনের নাম। এই গ্রামে ছয়টি বুথ আছে। ওই গ্রামেরই ৫৬ নম্বর পার্ট এ ২৬৫ জনের মধ্যে ২৫০ জনেরই নাম বাদ গিয়েছে।
আব্দুল মজিদ খান, ৩৭ চাপড়ার  ভোটার ।
  খান সম্প্রতি একটি ই-কমার্স কোম্পানির কাস্টমার সাপোর্ট টিমে কাজ করতেন।'আমার নিজের দেশেই আমাকে শরণার্থীর মতো অনুভব করানো হয়েছে। আমার ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং আগামীকাল আমাদের ওপর আরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।আমি অন্তত পাঁচ-ছয়টা নির্বাচনে ভোট দিয়েছি, আর এখন তারা ভোটার হিসেবে আমার পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।আমার নাম বিচারাধীন হওয়ার পর থেকেই আমি আমার স্ত্রীকে বলে আসছি যে, এবার আমি ভোট দিতে পারব কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। দ্বিতীয় সম্পূরক তালিকাটি দেখে আমি বাদ দেওয়া তালিকায় নিজের নাম দেখতে পেলাম। এটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার এক প্রহসন।শুনানিতে আমাকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয়নি, কিন্তু বিএলও আমাকে আমার স্কুল পাসের সার্টিফিকেট এবং আধার কার্ড জমা দিতে বলেন। আমি আমার আইসিএসই এবং আইএসসি পাসের সার্টিফিকেট জমা দিয়েছিলাম।
আমি  এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করব। কেউ কেউ আমাকে নতুন ভোটার হিসেবে পুনরায় আবেদন করার পরামর্শও দিচ্ছেন।আমি আমার মাকে নিয়ে চিন্তিত। তার বিচারও চলছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশিত দুটি সম্পূরক তালিকার কোনোটিতেই তার নাম ছিল না।
এখনও পর্যন্ত অনুমোদনপ্রাপ্ত ভোটারদের তালিকা দেখা যাচ্ছে না।তার অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। আমি জানি আমার নাম মুছে ফেলা হয়েছে। আমি জানি এরপর আমাকে কী করতে হবে। সে সেটাও জানে না।"
মোঃ আরসালান কামাল, ৩৬, একজন ভোটার।  কামাল  একটি বেসরকারি কোম্পানিতে বিক্রয় নির্বাহী হিসেবে কর্মরত। "আমার বাবা-মা ও দুই বোনের নাম ভোটার তালিকায় আছে, কিন্তু আমার নাম মুছে ফেলা হয়েছে।গণনা ফরম পূরণ করার সময়, আমি ম্যাপিংয়ের জন্য আমার বাবার নাম ব্যবহার করেছিলাম। আমার বাবা-মা দুজনেই ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিলেন। আমার একটি ভারতীয় পাসপোর্ট আছে এবং আমি তা দিয়ে বিদেশেও ভ্রমণ করেছি।
শুনানির জন্য আমার নাম উঠলে আমি আমার পাসপোর্ট ও জন্ম সনদ জমা দিয়েছিলাম । 
।আমার সঙ্গে  যা করা হয়েছে তাতে আমি অত্যন্ত মর্মাহত। এতগুলো নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর আমার নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। এটা আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।"