সেখ জাহিরউদ্দিন
 
ইতিমধ্যে তিনটি সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের আন্ডার অ্যাডজুডিকেশনে থাকা ৬০ লক্ষাধিক নাগরিকের মধ্যে ৩২ লক্ষ ভোটারের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। বাদ পড়েছেন প্রায় ১৩ লক্ষ। যেহেতু এই ভেরিফিকেশন একটি চলমান বিষয়, তাই সংখ্যাগুলি নিয়মিত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই যে ১৩ লক্ষ নাগরিক যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে এরা কিন্তু সকলেই ম্যাপড ভোটার। অর্থাৎ এই ভোটারদের হয়তো বা নিজের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল নয়তো পূর্বপুরুষের নাম ছিল। এরা সকলেই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা ও নাগরিক।

এই যে স্থায়ীভাবে বংশানুক্রমে বসবাসকারী বৈধ নাগরিকরা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লেন এদের জীবনে অকারনে বিনাদোষে নেমে আসতে পারে বহু রকমের সমস্যা। প্রথমত, ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে, ১৯৫০ অনুসারে সেই ব্যক্তি আর ভোট দিতে পারবেন না। একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অধিকার হলো ভোটাধিকার। যাদের নাম এই নতুন ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে তারা ভোটাধিকার হারাবেন। অবশ্য আগামীতে যদি কোন ভাবে নাম তুলতে পারেন সে ক্ষেত্রে আবার ভোটাধিকার ফিরে পেতে পারেন।
 
দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকমাত্রই ভোটাধিকার পাওয়ার অধিকারী তাই কোন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক যদি ভোটাধিকার হারান সে ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, কেবলমাত্র ভোটার তালিকায় থাকা কোনও বৈধ নাগরিকই নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে যুক্ত হতে পারেন। যদি কারোর নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে তিনি নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। চতুর্থত, যে কোনও সরকারি পদ ও সরকারি চাকরিতে নিযুক্তির ক্ষেত্রে কেবলমাত্র নাগরিকদেরই বিবেচনা করা হয়। তাই ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়ার অর্থ তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন চিহ্ন উঠে যাওয়া। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পক্ষে কোনও সরকারি পদে ও নিযুক্ত হওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে।
 

পঞ্চমত, ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে দেওয়ার পর সেই নাগরিককে ডিভোটার বা ডাউটফুল ভোটার বলে ঘোষণা করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে সেই নাগরিক আর কোনদিনই ভোট দিতে পারবেন না এবং কোন নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দাবি করতে পারবেন না।

ষষ্ঠত, ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে দেওয়া হয়েছে এমন ব্যক্তির নাগরিকত্ব যেহেতু সন্দেহের দৃষ্টিতে রয়েছে তাই নতুন করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জায়গা জমি কেনা বা রেজিস্ট্রি করা, সম্পত্তি হস্তান্তর করা, উত্তরাধিকার বন্টন করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা তৈরি হবে। সপ্তমত, যেহেতু ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়া ব্যক্তির নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে গেছে কিংবা আগামীতে হয়তো তিনি সুনির্দিষ্ট ভাবে কাগজে-কলমে প্রমাণ করতে পারবেন না। সেই ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হতে পারে। অষ্টমত, নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে গিয়ে আটক করা বা ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করা হতে পারে। অসমে এই ধরনের ঘটনার সাক্ষী হয়েছে দেশবাসী।
 
পরিশেষে, প্রথম থেকেই লক্ষ্যমুখী হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংখ্যালঘু ভোটারদের টার্গেট করে এই আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন আনা হয়েছে এবং সম্পূর্ণ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও সফটওয়্যার নির্ভর পদ্ধতিতে কাজকর্ম করা হয়েছে তাই প্রতিটি স্তরেই অস্পষ্টতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা প্রকাশ পেয়েছে। যে সমস্ত বৈধ নাগরিকদের কেবলমাত্র নির্বাচন কমিশনের গাফিলতিতে অথবা পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তারা অবিলম্বে ট্রাইবুনালে আপিল করুন। নিজের সমস্ত ডকুমেন্ট ও নিজের নিকট আত্মীয়দের ভোটার লিস্টে থাকা নামের প্রমাণ সংগ্রহ করে জমা দিন। এই কাজের জন্য মাত্র ১৫ দিন সময় আছে। জটিলতা এড়াতে যত দ্রুত সম্ভব আবেদন করে দিন।