পুবের কলম, ওয়েবডেস্ক: “আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখন!” (এসে গেছিস আমার মৃত্যুর তামাশা দেখতে!)— ফাঁসিকাঠের তোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রাক-মৃত্যুর সেই অট্টহাসি আর সোজা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে গোটা সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ক্ষমতা কেবল একজন অভিনেতারই ছিল। তিনি নানা পাটেকর।

বর্ষীয়ান এই অভিনেতার আকস্মিক প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ যখন শোকস্তব্ধ, তখন স্বাভাবিকভাবেই ফিরে ফিরে আসছে ৩০ বছরেরও বেশি সময় আগে মুক্তি পাওয়া তাঁর কালজয়ী ছবি ‘ক্রান্তিবীর’-এর (১৯৯৪) সেই দুটি অবিস্মরণীয় দৃশ্য।

মেহুল কুমার পরিচালিত ‘ক্রান্তিবীর’-এ প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রটি কেবল কোনো কাল্পনিক চরিত্র ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল অন্যায়, দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক ক্ষুব্ধ, রক্তাক্ত অথচ আপসহীন ভারতের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।

চলচ্চিত্র ইতিহাসে ‘ক্রান্তিবীর’-এর দুটি দৃশ্য আজও দর্শকদের শিহরিত করে। প্রথমটি হলো দুই ধর্মের মানুষের হাত কেটে রক্ত বের করে প্রদেয় সেই ঐতিহাসিক ডায়লগ— "ইয়ে হিন্দু কা খুন, ইয়ে মুসলমান কা খুন... বতা এতে কোনটা হিন্দু আর কোনটা মুসলমানের?

"

এই একটি প্রশ্ন ছিল ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো রাজনীতি ও মৌলবাদের মুখে এক মোক্ষম থাপ্পড়। শরীর বা রক্তের মধ্যে কোনো ধর্মীয় পরিচয় থাকে না—প্রকৃতির এই সহজ সত্যকে নানা পাটেকর এমন এক তীব্রতায় পর্দায় তুলে ধরেছিলেন, যা দর্শকদের লজ্জিত করে দেয়। আঘাতের যন্ত্রণা, স্বজন হারানোর বেদনা কিংবা রক্তের লাল রং—সবই এক। তবে আমরা কিসের ভিত্তিতে কাটাকাটি করছি?

নানার সেই গর্জন আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।

দ্বিতীয় স্মরণীয় মুহূর্তটি ছবির শেষভাগের ফাঁসির দৃশ্য। ফাঁসির দড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতাপ যখন জনতার দিকে তাকায়, তখন দৃশ্যটি কেবল একজন আসামির শাস্তি পাওয়ার চেনা দৃশ্য থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে আক্ষরিক অর্থেই সমগ্র মানবতার ফাঁসির এক জীবন্ত রূপক। রাজনীতিবিদ বা অপরাধীদের চেয়েও নানার প্রতাপ চরিত্রটি বেশি আঘাত করেছিল সেই সাধারণ মানুষকে, যারা অন্যায় দেখেও মুখ বুজে থাকে, অন্যায়ের তামাশা দেখে এবং তার পর নির্বিকারভাবে ঘরে ফিরে যায়। দেশপ্রেম মানে যে স্রেফ ফাঁপা স্লোগান নয়— অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং নীরবতার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে সত্যি কথা বলার সাহস দেখানোই যে আসল দেশপ্রেম, তা নানার সেই হুঙ্কারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

তিন দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, নানা পাটেকর আজ শারীরিক অনুপস্থিত। কিন্তু ‘ক্রান্তিবীর’-এর ফাঁসির মঞ্চ ও রক্ত পরীক্ষার সেই দৃশ্য থেকে ছিটকে আসা প্রশ্নগুলো আজ আজও বাতাসের মতোই জীবন্ত।