পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট খুব সম্প্রতি একটি রায় দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, কেউ যদি গরু পরিবহন করে, তবে তা জবাই করার জন্য কিংবা মাংস ভক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এমনটা ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। গরু পরিবহন ভারতীয় আইন সংহিতায় কোনও অপরাধ নয়। বেদ, উপনিষদের যুগেও গরু পরিবহন করা হত। কারণ, বিভিন্ন আশ্রমে গরু থাকত এবং এই শাস্ত্রগুলিতে গো-মাংস ভক্ষণেরও কথা উল্লেখ রয়েছে। আমাদের বিবেচ্য হচ্ছে, ভারতে কি গরু পরিবহন অপরাধ? কারণ, দুধ, নয়া প্রজনন ও চাষের জন্যও গরু কেনা-বেচা হয়ে থাকে। আর হয়ে থাকে বলেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার প্রথমে বন্ধ করলেও পরে পশু হাটগুলি খুলে দিয়েছে। তাই গরু পরিবহন করা না গেলে পশু হাটে কিভাবে গরু কেনা-বেচা হবে?
তবে শিলিগুড়ির এসপি অর্থাৎ পুলিশ বিভাগ ও প্রশাসন সম্ভবত মনে করে গরু পরিবহন একটি অজামিনযোগ্য গুরুতর অপরাধ। কারণ, সম্প্রতি বাগডোগরা থানার অধীনে বা কাছাকাছি এলাকায় ‘গরুচুরি’ করা হচ্ছে সন্দেহে কিছু ব্যক্তি দু’জনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও একটি ক্ষেত্রে মাথায় বড় পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যা করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে ২ অক্টোবর ভোর রাতে। আর এলাকা হচ্ছে তারাবাড়ি এবং ধিমাল বস্তি এলাকা। সম্প্রতি বাগডোগরা ও মাটিগাড়া অঞ্চলে উগ্রবাদীদের প্রভাব বেড়েছে।
বলা হচ্ছে, এখানে যারা ‘গরুচুরি’ করতে এসেছিল, তারা নিয়ে এসেছিল একটি দামি গাড়ি এবং একটি পিকআপ ভ্যান। স্থানীয় একটি দৈনিক সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী গণপিটুনির জেরে শনিবার (৩ অক্টোবর) মৃত্যু হয়েছে ২ তরুণের। চুরি করেছে স¨েহে পরে পুলিশ আরও যে ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে ৩ তরুণের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
সবথেকে আশ্চর্যজনক হচ্ছে, এই ‘গরু চোররা’ সবই কিন্তু বাংলার মুসলিম নন। যেমন নিহত সাদ মুহাম্মদ (২৮) হরিয়ানার বাসিন্দা। এছাড়া পত্রিকায় বলা হয়েছে, গ্রেফতারকৃত ও ভয়ানকভাবে আহত আমীর সাত্তার, আরিফ খান ও আক্রম খানের বাড়িরও হরিয়ানায়। তারাও শিলিগুড়ির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এছাড়া উত্তর দিনাজপুরের মুহাম্মদ রাকিব, হরিয়ানার মুহাম্মদ আজাদ, কিষেনগঞ্জের মুহাম্মদ আনারুল ও গোয়ালপোখরের নূর মুহাম্মদকেও পুলিশ গ্রেফতার করেছে এবং তাদের আদালতে পেশ করা হয়েছে। অপর নিহত শাহীদ আখতারের (৪৫) চোপড়ার সোনাপুর গ্রামে। পেশায় তিনি গাড়ি চালক। শাহীদের স্ত্রী ছাড়াও দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
পুলিশের সমস্ত চেষ্টা নিয়োজিত রয়েছে যাদের ‘গরুচোর’ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের পাকড়াও করে বাহবা কুড়ানোর দিকে। মৃত শাহীদের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা অনেক কষ্টে বাগডোগরা থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, যদি আমার স্বামী অপরাধী হয়ে থাকেন তাহলে তার হাত-পা ভেঙে দিয়ে পুলিশে দিতে পারত। হত্যা করবে কেন? হত্যা করার অধিকার কি কারও রয়েছে?
আর একটি বিষয়ও লক্ষণীয়। দেখা যাচ্ছে ‘গরুচোর’ বলে যাদের ধরা হয়েছে তাদের অনেকেই হরিয়ানার বাসিন্দা। এককজন বিহারের এবং বাকিরা উত্তরবঙ্গের।
তাহলে বোঝা যায়, ‘গরুচুরির’ জন্য একটা লম্বা ও সুদীর্ঘ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। যা হাজার হাজার মাইল বিস্তূত। এখন বাংলাদেশে গরু পাচার করে লাভ করার তেমন কোনও সুযোগ নেই। কারণ, বিএসএফ বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশিরা বেশকিছু গরু খামার তৈরি করেছে। ফলে তারা নিজেরাই আভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। পশুহাট ও কুরবানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন পশু কেনা বা সংগ্রহের চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। হ্রাস পেয়েছে দামও। আর এলাকাটি আমাদের দেশের জন্য সংবেদনশীল চিকেন নেকের কাছাকাছি হওয়ায় সীমান্তে বিএসএফ-এর কড়া নজরদারি রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে পাচারের প্রশ্নই ওঠে না। আর এই গবাদি পশুগুলিকে হরিয়ানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলা মূর্খামি হবে। কারণ, বাংলাদেশে পাচারের জন্য ভারতের যে সব এলাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গে গরু আসত, তার মধ্যে রয়েছে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, গুজরাত, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি রাজ্য।
আর একটি প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। একটা গরু বিক্রি করে কত টাকা লাভ হয় আজকের দিনে? তাই দামি গাড়ি এবং পিকআপ ভ্যান নিয়ে কেন সুদূর হরিয়ানা থেকে ‘গরুচোররা’ বাগডোগরায় আসবে? তাদের যদি চুরি করারই উদ্দেশ্য থাকে, তবে হরিয়ানা ও আশেপাশে চুরি ও অসামাজিক কাজ করার মতো অনেককিছুই রয়েছে। আর কিনে বিক্রি করলেও কিন্তু গরুপিছু খুব বেশি লাভ হওয়ার এখন আর সম্ভাবনা নেই। কারণ, গরুর দাম ইতিমধ্যেই পড়ে গেছে। এমনকি গো-পালক ঘোষরাও এ নিয়ে বেশ কয়েকবার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। মূলত তাদের চাপেই বাংলার সরকার পশুহাট পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আর একটি কথা উল্লেখযোগ্য। গরু পাচারের জন্য দামি গাড়ি ও পিকআপ ভ্যান থাকা সত্ত্বেও কিন্তু কোনও অভিযুক্তই গরু-সহ ধরা পড়েনি। তাহলে কেন এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ? মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুবাবু এই ধরনের হত্যার ঘোরতর বিরোধী। তাই তিনি ওয়াকফ আন্দোলনের সময় ধুলিয়ানের দিকে দু’জন হিন্দুকে হত্যা করার কথা বার বার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন। তবে বাগডোগরা অঞ্চলে নির্মমভাবে হত্যা ও জখম করা নিয়ে তিনি মুখ খোলেননি। সত্যি কথা বলতে গেলে, পশ্চিমবঙ্গের কোনও রাজনৈতিক দল তা সে সিপিএম, কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেস যেই হোক না কেন, কোনও বিবৃতি দেয়নি। তবে শিলিগুড়ির পুলিশ সুপার অনির্বাণ মজুমদারকে সাবাশ্ দিতে হবে! তিনি ব্যাপক তৎপরতায় অনেকের সাহায্য নিয়ে সব ‘গরুচোর’গুলিকে চিহ্নিত করে হেফাজতে নিয়েছেন। তাঁর মতো পুলিশ সুপার আগে থাকলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে গরু পাচার ১০-১৫ বছর আগেই বন্ধ হয়ে যেত।
এখন প্রশ্ন, যারা নির্দয়ভাবে দু’টি মানুষকে হত্যা করল এবং আরও তিনজনকে প্রায় আধমরা করে তুলল, তাদের কি পাকড়াও করার কোনও ইচ্ছা পুলিশের রয়েছে? কারণ, গাড়ি ও লাশের দর্শক হিসেবে কিছু কিছু ছবি মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। তাদেরও তো জিজ্ঞাসাবাদ করা যেত! যাইহোক, যারা আখলাককে মেরেছিল, যারা নিয়মিত মেয়াদে গো-রক্ষক সেজে পুলিশের নীরবতায় মুসলিমদের হত্যা করেছে, তাদেরও তো কারও কোনও বিচার হয়নি। গ্রেফতারিও হয়েছে নামমাত্র। তাই পশ্চিমবঙ্গেও আলাদা কিছু হবে, এই ভাবনাটাই হয়তো ভুল।
পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলিম, সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে পুবের কলম যোগাযোগ করেছিল যে তাদের কোনও প্রতিনিধি দল অবস্থা দেখার জন্য এবং মৃত ও আহতদের পরিবারগুলিতে সান্তনা দেওয়ার জন্য এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলার উদ্দেশে শিলিগুড়ি যাবে কি না? তারা প্রত্যেকেই বলেন, তাদের সেই ধরনের কোনও পরিকল্পনা নেই। তাই সুবিচার চাওয়ার অধিকারও হয়তো এপার বাংলার মুসলিমদের খুব একটা নেই!