পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার আবহে দেশবাসীর উদ্দেশে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। 

করোনাকালের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে তিনি আবারও “ওয়ার্ক ফ্রম হোম” বা বাড়ি থেকে কাজের সংস্কৃতি চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে পেট্রল-ডিজ়েল, রান্নার গ্যাস, ভোজ্য তেল, রাসায়নিক সার ও সোনার ব্যবহার কমানোর আবেদনও করেন তিনি। এমনকি আগামী এক বছর বিদেশভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রবিবার তেলঙ্গানার সেকেন্দরাবাদে এক জনসভা থেকে মোদী বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ভারতের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং তার ফলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে গত কয়েক বছরের বিশ্ব পরিস্থিতির কথাও। তিনি বলেন, করোনা অতিমারির সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছিল। সেই ধাক্কা কাটতে না কাটতেই শুরু হয় ইউক্রেন যুদ্ধ। তার প্রভাব পড়ে খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও সারের বাজারে। এখন পশ্চিম এশিয়ার নতুন সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল, রান্নার গ্যাস, ভোজ্য তেল ও রাসায়নিক সারের দাম ক্রমশ বাড়ছে।

মোদীর কথায়, “ভারতের কাছে বিশাল তেলের ভান্ডার নেই। আমাদের প্রয়োজনীয় পেট্রল, ডিজ়েল, গ্যাসের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব ভারতের উপর পড়ে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার থেকেও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।”

এই পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র সরকারের পক্ষে সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, দেশের প্রতিটি নাগরিককে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তিনি বলেন, “দেশের জন্য শুধু প্রাণ দেওয়া নয়, দেশের জন্য বাঁচা এবং দেশের স্বার্থে নিজের দায়িত্ব পালন করাও দেশভক্তি।


ফের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর আহ্বান
করোনা অতিমারির সময়ে গোটা বিশ্বে বাড়ি থেকে কাজের সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়েছিল। অফিসের মিটিং, ব্যবসায়িক আলোচনা থেকে শুরু করে শিক্ষা— সব কিছুই চলে গিয়েছিল অনলাইন মাধ্যমে। সেই অভিজ্ঞতার কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আবারও ওয়ার্ক ফ্রম হোমের উপর জোর দেন।

তিনি বলেন, “করোনার সময়ে আমরা অনলাইন মিটিং করেছি, ভিডিয়ো কনফারেন্স করেছি, বাড়ি থেকে কাজ করেছি। সেই ব্যবস্থার সঙ্গে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। এখন যদি আমরা আবার প্রয়োজন অনুযায়ী সেই ব্যবস্থাগুলিকে গুরুত্ব দিই, তাহলে দেশের উপকার হবে।”
মোদীর মতে, প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ অফিস যাতায়াতে যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করেন, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের মাধ্যমে তার একটি বড় অংশ কমানো সম্ভব। এতে যেমন পেট্রল-ডিজ়েলের খরচ কমবে, তেমনই বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। একইসঙ্গে শহরের যানজট এবং দূষণও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।

দেশবাসীর কাছে জ্বালানি ব্যবহারে সংযমী হওয়ার আবেদন জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “শহরে মেট্রো পরিষেবা থাকলে যতটা সম্ভব মেট্রো ব্যবহার করুন। ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে কারপুল ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকুন। অফিসে বা অন্য কোথাও যাওয়ার সময় একাধিক মানুষ একসঙ্গে যাতায়াত করলে জ্বালানির অপচয় কমবে।”

তিনি আরও বলেন, দেশের পরিবহণ ব্যবস্থায় রেলপথের ব্যবহার বাড়ানো উচিত। পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও যতটা সম্ভব মালগাড়ি ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি। ডিজ়েলচালিত যানবাহনের বদলে বৈদ্যুতিন গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর উপরেও জোর দেন মোদী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের আমদানি বিলের একটি বড় অংশই জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পরিবহণেই নয়, খাদ্যদ্রব্য থেকে শিল্পপণ্য— সর্বত্র পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বেড়ে যায়। সেই কারণেই প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি ব্যবহারে সতর্কতা ও সংযমের উপর এত গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

মোদীর বক্তব্যে উঠে আসে ভোজ্য তেলের প্রসঙ্গও। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোজ্য তেল আমদানিকারক দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বাজারে। এই পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে রান্নায় অন্তত ১০ শতাংশ কম তেল ব্যবহারের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “ভোজ্য তেল আমদানি করতেও বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। প্রত্যেক পরিবার যদি একটু করে তেলের ব্যবহার কমায়, তাহলে দেশের অনেক উপকার হবে। এতে শুধু দেশের অর্থ সাশ্রয় হবে না, মানুষের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হবে।”
প্রধানমন্ত্রীর মতে, অতিরিক্ত তেল খাওয়ার ফলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতার মতো নানা অসুখ বাড়ছে। তাই তেল কম খাওয়া স্বাস্থ্য সচেতনতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে চমকপ্রদ আবেদন ছিল সোনার গয়না কেনা বন্ধ রাখার আহ্বান। মোদী বলেন, “সোনা আমদানির জন্যও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এক সময়ে যুদ্ধ বা সঙ্কটের সময়ে মানুষ দেশের জন্য সোনা দান করতেন। এখন দান করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অন্তত এক বছর আমরা যদি নতুন সোনার গয়না না কিনি, তাহলে দেশ অনেকটা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারবে।”

ভারতে বিয়ে, উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠানে সোনার ব্যবহার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা আমদানিকারক দেশ ভারত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বাড়লে তার চাপও পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি কমাতে পারলে চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী এক বছর বিদেশে বেড়াতে না যাওয়ার জন্যও আবেদন জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আজকাল অনেকেই বিদেশে গিয়ে বিয়ে করেন, বিদেশে ঘুরতে যান।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্যরকম। অন্তত এক বছরের জন্য বিদেশভ্রমণ স্থগিত রাখুন। ভারতের মধ্যেই অনেক সুন্দর জায়গা রয়েছে। দেশে ভ্রমণ করলে দেশের অর্থ দেশের মধ্যেই থাকবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশ ভ্রমণে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। পর্যটন খাতে বিদেশে অর্থ ব্যয় কমাতে পারলে তা দেশের অর্থনীতির উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কৃষিক্ষেত্র নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার শুধু জমির ক্ষতিই করছে না, সারের আমদানির ফলে দেশের উপর আর্থিক চাপও বাড়াচ্ছে। তাই কৃষকদের রাসায়নিক সারের ব্যবহার ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে প্রাকৃতিক কৃষিকাজের দিকে ঝোঁকার আহ্বান জানান তিনি।
মোদীর কথায়, “রাসায়নিক সারের কারণে ধরিত্রী মায়ের ক্ষতি হচ্ছে। জমির উর্বরতা কমছে। ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনের উপরেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই এখন থেকেই আমাদের সতর্ক হতে হবে।”
চাষের ক্ষেত্রে ডিজ়েলচালিত পাম্পের বদলে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প ব্যবহারের উপরেও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, এতে কৃষকদের খরচ কমবে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।

পুরো বক্তব্যে বারবার দেশপ্রেম ও নাগরিক দায়িত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “দেশের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেওয়া যেমন দেশভক্তি, তেমনই দেশের সঙ্কটের সময়ে নিজের অভ্যাস বদলানোও দেশভক্তি।”
মোদীর মতে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট সচেতনতা— যেমন কম জ্বালানি ব্যবহার, কম তেল খাওয়া, অপ্রয়োজনীয় বিদেশভ্রমণ এড়ানো বা সোনা না কেনা— এগুলিই দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, প্রধানমন্ত্রী একদিকে যেমন অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন, তেমনই মানুষের মধ্যে আত্মনির্ভরতা ও সংযমের মানসিকতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তবে বিরোধীদের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র নাগরিকদের সংযমের উপর নির্ভর না করে সরকারেরও আরও কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।