বিহারের মুঙ্গেরে অবস্থিত একটি বিশাল বটগাছের বয়স বৈজ্ঞানিকভাবে অন্তত ৭০০ বছর বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো নির্ভুলভাবে বয়স নির্ধারিত Ficus benghalensis বা বটগাছ। Quaternary Research জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় উচ্চ-নির্ভুলতার রেডিওকার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে গাছটির বয়স নির্ধারণ করা হয়। ফলে স্থানীয় লোককথা বা ঐতিহাসিক নথির ওপর নির্ভর না করে প্রথমবারের মতো গাছটির বয়সের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেল।
গবেষণাটি ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল প্রকাশিত হয় এবং পরে ৩ জুলাই ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের (DST) কাছ থেকে সরকারি স্বীকৃতি পায়। মুঙ্গেরে ইন্ডিয়ান টোব্যাকো কোম্পানির ক্যাম্পাসে গাছটি রয়েছে। ওই স্থানটি ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, বহু বছর ধরে এই বটগাছটি শাসক ও সাধারণ মানুষের মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এর প্রকৃত বয়স আগে নির্ভুল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হয়নি।

বিহার বন দফতরের অনুরোধে লখনউয়ের বীরবল সাহনি ইনস্টিটিউট অব প্যালিওসায়েন্সেসের ড. তৃণা বোস গাছটির বয়স নির্ধারণের গবেষণা শুরু করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের অধীনস্থ এই স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের গবেষক দলের নেতৃত্ব দেন ড. বোস। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ড. মায়াঙ্ক শেখর এবং ড. অখিলেশ কে. যাদব।

বটগাছের বয়স নির্ধারণে গবেষকদের একটি বিশেষ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের চওড়া পাতার গাছগুলিতে সাধারণত স্পষ্ট বার্ষিক বৃদ্ধির বলয় থাকে না। ফলে প্রচলিত ট্রি-রিং পদ্ধতিতে এসব গাছের বয়স নির্ধারণ কঠিন। দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী বটগাছগুলোর বয়স নির্ধারণে তাই এতদিন লিখিত নথি, লোককথা ও স্থানীয় জনশ্রুতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়েছে।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে গবেষকরা এমন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে গাছের কেন্দ্রীয় অংশ বা ‘পিথ’-এর কাছাকাছি কাঠ সংগ্রহ করা যায়। পিথ হলো গাছের সেই কেন্দ্রীয় অংশ, যেখানে গাছের বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে সবচেয়ে পুরনো কাঠ তৈরি হয়।

মুঙ্গেরের বটগাছটির একটি উন্মুক্ত দ্বিতীয় কাণ্ড এবং একটি প্রাচীন প্রধান শাখা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

গবেষকরা কাঠের নমুনা থেকে আলফা-সেলুলোজ পৃথক করেন। এটি উদ্ভিদের কোষপ্রাচীরের সবচেয়ে স্থিতিশীল প্রধান উপাদানগুলোর একটি এবং রেডিওকার্বন বিশ্লেষণের জন্য উপযোগী। এরপর Accelerator Mass Spectrometry (AMS) বা অ্যাক্সেলারেটর মাস স্পেকট্রোমেট্রি ব্যবহার করে নমুনাগুলোর উচ্চ-নির্ভুলতার রেডিওকার্বন ডেটিং করা হয়।
পরবর্তীতে IntCal20 ক্যালিব্রেশন কার্ভ এবং OxCal সফটওয়্যার ব্যবহার করে ফলাফলগুলো ক্যালিব্রেট করা হয়। গবেষণায় পিথ সঠিকভাবে শনাক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। উষ্ণমণ্ডলীয় শক্ত কাঠের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি খুব কমই ব্যবহার করা হয়, কারণ এ ধরনের গাছের বৃদ্ধির বলয়ের সীমা সাধারণত স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষণে দ্বিতীয় কাণ্ডের নমুনার রেডিওকার্বন বয়স পাওয়া যায় ২৭৬ ± ৩৬ বছর BP এবং প্রধান প্রাচীন শাখার নমুনার বয়স ৬৫২ ± ৩৭ বছর BP। এই ফলাফল গাছটির ন্যূনতম বয়স প্রায় ৭০০ বছর হওয়ার পক্ষে প্রমাণ দেয়।


এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ওই এলাকার ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন ধারণা তৈরি করেছে। আগে ধারণা করা হতো, ঐতিহাসিক ‘বুড়া বাংলো’-র সামনে বটগাছটি লাগানো হয়েছিল। স্থাপত্যশৈলী দেখে ওই ভবনটি মুঘল আমলের শেষভাগ ও ব্রিটিশ আমলের শুরুর সময়ের—প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পুরনো বলে মনে করা হয়। কিন্তু বটগাছটির বয়স ভবনটির চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় গবেষকরা মনে করছেন, গাছটি ভবন নির্মাণেরও আগে সেখানে ছিল।

গবেষকদের মতে, বটগাছটি সম্ভবত ওই এলাকায় একসময় থাকা প্রাকৃতিক অরণ্যের একটি অবশিষ্ট অংশ। ভবনটি নির্মাণের সময়ও গাছটি সেখানে বিদ্যমান ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় লোককথায় এই স্থানটি শাসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা, গ্রামসভা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়।

বটগাছ উষ্ণমণ্ডলীয় বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর বিস্তৃত শাখা ও অসংখ্য দ্বিতীয় কাণ্ড পাখি, কীটপতঙ্গসহ বিভিন্ন প্রাণীর জন্য আবাসস্থল তৈরি করে। পাশাপাশি ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও বটগাছের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। এর বিশাল ছায়াঘেরা বিস্তৃতির কারণে ঐতিহ্যগতভাবে বটগাছের নিচে সামাজিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে।