বিপুল শঙ্কর বসু: মঙ্গলবার রাতে ‘জেলমুক্তি’-র পর যখন ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শরীরে নিজের মাটির ঘরের চেনা বিছানাটায় শুয়ে পড়লেন ৬৬ বছর বয়সী জলিল আখতার, তখন যেন এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের অবসান হল। প্রায় তিন মাস পর ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’র মিথ্যা তকমা গা থেকে ঝেড়ে ফেলে ঘরে ফিরেছেন তিনি। ফলে বুধবার সকাল হতেই ইসলামপুরের বাঘরাই গ্রামের এই জীর্ণ বাড়িতে ভিড় জমিয়েছেন প্রতিবেশীরা। স্বস্তির হাসির আড়ালে সবার চোখে-মুখে তখনও তাড়া করে ফিরছে গত নব্বই দিনের সেই অমানবিক লড়াইয়ের আতঙ্ক।
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় তিন মাস আগের এক রাতে। এশার নামাজ পড়ে বিছানায় সবে শুয়েছিলেন জলিল আখতার। রাত তখন সাড়ে ১১ টা। হঠাৎই বাড়িতে হানা দেয় ডালখোলা থানার পুলিশ। গ্রামে মারামারি হয়েছে এবং সেই বাড়ি দেখিয়ে দেওয়ার নাম করে তাঁকে বিছানা থেকে ডেকে বাইরে আনা হয়। বাইরে আসতেই হাত চেপে ধরে সোজা তোলা হয় পুলিশের গাড়িতে। মাঝ রাস্তায় আঙুলে ভোটের কালির দাগ না থাকার অজুহাত তুলে তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ দেগে দেওয়া হয়।

এমন লোমহর্ষক ঘটনার কথা শোনালেন জেল থেকে সদ্য ঘরে ফেরা বৃদ্ধ জলিল আখতার। 
পরের দিনগুলোতে যা ঘটেছে, তা যে কোনও রূপকথা কিংবা দুঃস্বপ্নকেও হার মানায়। এসপি অফিসে ভোটার কার্ড মিলিয়ে দেখার পর খোদ তদন্তকারী আধিকারিক স্বীকার করেছিলেন জলিলবাবু ভারতীয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁকে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে কেস সাজিয়ে পাঠানো হয় চাকুলিয়া হোল্ডিং সেন্টারে। জলিল আখতারের আইনজীবী সাহিদ রেজার কথায় উঠে এসেছে এক বৈধ ভারতীয় নাগরিককে ‘বাংলাদেশি’ সাজানোর অপপ্রয়াসের কাহিনী।

তিনি জানান, সেখান থেকে তাঁকে পুশইনের জন্য তুলে দেওয়া হয় বিএসএফ-এর হাতে। সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য সীমান্তে দাঁড় করানো হয় আরও পাঁচজন বাংলাদেশির সঙ্গে। কিন্তু বৃদ্ধের অটুট বিশ্বাস আর বুক চিতিয়ে দেওয়া জবাবে থমকে যায় পুশব্যাকের প্রক্রিয়া। জলিল আখতার সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমাকে মেরে ফেললেও বলব আমি ভারতীয়।’
এদিন তিনি এতদিনের অজানা কথা প্রকাশ্যে টেনে এনে বলেন, সীমান্তের বিএসএফ  ক্যাম্পের জওয়ানরাও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আমি ভারতীয়। এরপর বিএসএফ আধিকারিকরা তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার পরও পুলিশ ফের তাঁকে সীমান্তে পাঠানোর চেষ্টা করে।

সীমান্ত আর জেলের মধ্যে এক অবর্ণনীয় টানাপোড়েনে দিন কেটেছে এই বৃদ্ধের। অবশেষে ডালখোলা থানা তাঁকে আদালতে পেশ করলে স্থান হয় ইসলামপুর জেলে। বলতে বলতে চোখে পানি এসে গেল জলিলের। 

অসহায়, হতদরিদ্র এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। দুই ছেলে পেটের দায়ে বহু দূরে হায়দরাবাদে শ্রমিকের কাজ করেন। এই চরম বিপর্যয়ে একাই আইনি লড়াইয়ের হাল ধরেন তাঁর ফুপাতো ভাই মতিউর রহমান। তিনি জানান, ‘অত্যন্ত গরিব মানুষ, ওঁর বাড়িটা দেখলে চোখে জল আসবে আপনাদের। আমি যদি না দৌড়াদৌড়ি করতাম, তবে হয়তো মানুষটা জেলেই পচে মরতো।’
তবে অন্ধকারের মধ্যেও মানবতার এক অনন্য নজির গড়েছেন আদালতের আইনজীবীরা। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, এক পয়সাও পারিশ্রমিক না নিয়ে এই নিঃস্ব বৃদ্ধের হয়ে আদালতে লড়াই চালান তাঁরা। তাঁদের অক্লান্ত আইনি লড়াইয়ের ফলেই অবশেষে জামিনে মুক্ত হয়ে সসম্মানে ঘরে ফিরলেন জলিল আখতার।

 
এছাড়াও জলিলের হয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে ‘ভোটাধিকার সুরক্ষা সমন্বয় সমিতি’ নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তারাও প্রথম থেকে জলিলকে ঘরে ফেরানোর এই লড়াইয়ে শামিল ছিল। তাদেরও বক্তব্য ছিল, জলিল ভারতীয় নাগরিক। তার বিরুদ্ধে হওয়া এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। যত দূর প্রয়োজন যেতে হবে। এই ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করতেই হবে। উল্লেখ্য, এই সংগঠনটিই প্রথম জলিলের বিষয়টি সামনে আনে। তাকে ঘরে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়। ৮৯দিন পরে জলিল অবশেষে ঘরে ফেরায় তারাও খুশি।  
ঘরের ভাঙা বিছানায় বসে ক্লান্ত গলায় বৃদ্ধ জলিল আখতার শুধু এটুকুই বললেন, ‘তিন মাস আমাদের পরিবারটা খুব কষ্টে কাটিয়েছে। না ঠিকমতো ঘুম হয়েছে, না খাওয়া জুটেছে। আজ নিজের ঘরে ফিরে ভালো লাগছে।’ তবে তিনি ঘরে ফিরলেও প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, একজন বৈধ ভারতীয় নাগরিককে রাতের অন্ধকারে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে তিন মাস ধরে এই নির্মম ট্রমা উপহার দিল কে? কার ভুলে জীবন থেকে হারিয়ে গেল জীবনের তিনটে মূল্যবান মাস?