সেখ কুতুবুদ্দিনঃ মহাবিশ্বের অন্যতম দুর্বোধ্য অধ্যায়—ব্ল্যাক হোল—নিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে নতুন করে বিচার করতে বাধ্য করছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান পত্রিকা ফিজিক্স লেটার্স বি-এ প্রকাশিত “একজ্যাক্ট গ্রাভাস্টার সলিউশন” প্রবন্ধটি যেন মহাজাগতিক ব্যাখ্যার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

এতদিন পর্যন্ত সাধারণ ধারণা ছিল, বৃহদায়তন নক্ষত্রের পতনের চূড়ান্ত ফলাফলই হলো ব্ল্যাক হোল—এক এমন সত্তা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে অসীম ঘনত্বের সিঙ্গুলারিটি এবং যার আকর্ষণ থেকে আলো পর্যন্ত রেহাই পায় না। কিন্তু এই নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, সেই চূড়ান্ত পরিণতির আরেকটি সম্ভাব্য রূপও থাকতে পারে।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ফারুক রহমান এবং তাঁর গবেষক দল, বিক্রমার্ক এস. চৌধুরী (যাদবপুর  বিদ্যাপীঠের ছাত্র) , অরিত্র সান্যাল (কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, কাশীপুরের ছাত্র), আনিকুল ইসলাম  (ধানগড়া বিশনপুর হাই মাদ্রাসার ছাত্র) ও বিদিশা সামন্ত (তাঁতিশাল নবনলিনী গার্লস হাই স্কুলের ছাত্রী)  এমন একটি বিকল্প কাঠামোর কথা তুলে ধরেছেন, যাকে বলা হচ্ছে গ্রাভাস্টার। এই ধারণায়, মহাকর্ষীয় পতনের শেষে অন্ধকার গহ্বরের  বদলে তৈরি হতে পারে এক বিশেষ ধরনের স্থিতিশীল গঠন—যা অনেকটা এক “মহাজাগতিক বুদবুদ”-এর মতো।

ভেতরের চাপ ও বাহ্যিক মহাকর্ষের সূক্ষ্ম ভারসাম্যে এটি নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখে।

এই কাঠামোর কেন্দ্রস্থলে রয়েছে “ ডি সিটার স্পেস “-সদৃশ একটি অঞ্চল, যেখানে ঋণাত্মক চাপ পদার্থকে সংকুচিত না করে বাইরে ঠেলে দেয়। ফলে সিঙ্গুলারিটির উদ্ভবই ঘটে না। এই কেন্দ্রীয় অংশকে ঘিরে থাকে একটি ঘন ও সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত শেল, যা এই গবেষণার একটি বড় সাফল্য—কারণ আগের কাজগুলোতে এই স্তরটি যথেষ্ট নির্ভুলভাবে নির্ধারিত ছিল না। এখানে প্রথমবারের মতো আইনস্টাইনের ফিল্ড সমীকরণের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল সমাধানের মাধ্যমে এই কাঠামোকে দৃঢ় গাণিতিক ভিত্তি দেওয়া হয়েছে। বাইরের অঞ্চলটি আবার এমনভাবে গঠিত, যা পর্যবেক্ষকের কাছে ব্ল্যাক হোলের মতোই আচরণ করে।

এটি দেখতে কেমন হতে পারে? গ্রাভাস্টার, অর্থাৎ এক ধরনের মহাজাগতিক সাবানের বুদবুদ, ব্ল্যাক হোলের মতোই বিপুল ভর ধারণ করতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, একটি সাধারণ গ্রাভাস্টারের আকার কলকাতা শহরের সমান হতে পারে, অথচ তার ভর হতে পারে আমাদের সূর্যের ভরের প্রায় দশ গুণ। বাইরে থেকে এটি অনেকটাই ব্ল্যাক হোলের মতো আচরণ করলেও এর অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

গবেষকরা শুধু তাত্ত্বিক মডেল প্রস্তাব করেই থেমে থাকেননি; তারা এর ভৌত গ্রহণযোগ্যতাও বিশ্লেষণ করেছেন। Causality (কারণ–কার্য সম্পর্ক—অর্থাৎ কোনো তথ্য বা প্রভাব আলোর গতিকে অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়তে পারে না)-এর শর্ত, শক্তির নিয়মাবলি, স্থিতিশীলতার মানদণ্ড এবং আলো নির্গমনের সময় রেডশিফটের আচরণ—সব ক্ষেত্রেই এই মডেলটি সফলভাবে টিকে থাকে।

এমনকি এর এন্ট্রপি বৈশিষ্ট্যও নির্দেশ করে যে এটি একটি সুশৃঙ্খল ও স্থিতিশীল গঠন, কোনো বিশৃঙ্খল অবস্থা নয়।

সার্বিকভাবে, গ্রাভাস্টার নিয়ে গবেষণা শুধু ব্ল্যাক হোলের একটি সম্ভাব্য বিকল্প ব্যাখ্যাই প্রদান করে না, বরং মহাকর্ষ, কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামো সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিরও দ্বার উন্মোচন করে। এই ধারণা আমাদেরকে মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুর প্রকৃতি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—গ্রাভাস্টার কি সত্যিই প্রকৃতিতে বিদ্যমান এবং পদার্থবিজ্ঞানের কিছু গভীর সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম, নাকি এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক সম্ভাবনা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, উচ্চ-শক্তির জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে গ্রাভাস্টারের সম্ভাব্য অস্তিত্ব অনুসন্ধান করছেন। বিজ্ঞান এভাবেই এগিয়ে চলে—পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্যের যত কাছাকাছি পৌঁছানো যায়, ততই আমাদের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হয়।

অবশেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়—মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি কি শুধুই ব্ল্যাক হোল, নাকি তার আড়ালে নীরবে বিদ্যমান রয়েছে এমন এক বিকল্প বাস্তবতা, যেখানে অন্ধকারের পরিবর্তে গড়ে উঠেছে শান্ত, সুশৃঙ্খল এবং গভীরভাবে রহস্যময় এক কাঠামো—গ্রাভাস্টার?