ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত নিরসনে দ্রুত কোনও সমঝোতা চুক্তি হলে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো। বিশেষ করে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের আশঙ্কা, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কেবল রাজনৈতিক সাফল্যের কৃতিত্ব নিতে গিয়ে জটিল কারিগরি বিষয়গুলো উপেক্ষা করে একটি অপরিণত চুক্তির পথে হাঁটতে পারে।
আরও পড়ুন:
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন—যদি তাড়াহুড়ো করে কোনও ‘ভাসা-ভাসা’ চুক্তি করা হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে স্থায়ী সমাধানের বদলে আরও বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, ইরানের পারমাণবিক ইস্যু অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর প্রতিটি ধাপ সুপরিকল্পিত ও কারিগরি যাচাইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:
ইউরোপীয় দেশগুলোর দাবি, ২০০৩ সাল থেকে তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কাজ করে আসছে।
দীর্ঘ দুই দশকের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তারা জানে, এমন চুক্তি কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছায় নয়, বরং ধৈর্য, দক্ষতা ও বহুস্তরীয় আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন সেই অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিয়ে এককভাবে দ্রুত সমাধানে পৌঁছাতে চাইছে বলেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।আরও পড়ুন:
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির অন্যতম সমন্বয়কারী ফেডেরিকা মোঘেরিনি সতর্ক করে বলেছেন, সেই চুক্তি সম্পন্ন করতে প্রায় ১২ বছর সময় এবং বিপুল কূটনৈতিক শ্রম লেগেছিল। ফলে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের আলোচনায় একই ধরনের কার্যকর চুক্তি সম্ভব নয়।
বর্তমানে ইসলামাবাদে চলমান আলোচনায় মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্ন।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্রের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকলেও, এমন জটিল কূটনৈতিক আলোচনায় প্রয়োজন গভীর নীতিগত দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক পরমাণু রাজনীতির বাস্তব জ্ঞান। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ভাষায়, কয়েকটি পয়েন্টে সমঝোতা হলেই সমস্যা মিটে যায় না; বরং প্রতিটি ধারা নতুন নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।
যদিও হোয়াইট হাউস এই সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের মুখপাত্র অ্যানা কেলি দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভালো চুক্তি করতে জানেন এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতেই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে ইউরোপীয় মিত্রদের মতে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পূর্ণ প্রবেশাধিকার ও কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা ছাড়া কোনও চুক্তিই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
অন্যদিকে, ইরান ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে যে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত। ফলে দরকষাকষির টেবিলে তাদের অবস্থান আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী। তেহরানের প্রধান দাবি এখন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও অ-আগ্রাসন চুক্তি। তবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো চাইছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকেও আলোচনার আওতায় আনা হোক—যা নিয়ে কোনও আপসের ইঙ্গিত দেয়নি তেহরান।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি তড়িঘড়ি করে একটি অপরিণত চুক্তি করা হয়, তাহলে তা সাময়িক কূটনৈতিক সাফল্য আনলেও ভবিষ্যতে আরও বড় অচলাবস্থা ও উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।