সেখ কুতুবউদ্দিনঃ লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী প্রাকৃতিকভাবে মাটি থেকে পাওয়া এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া ‘ব্যাসিলাস সাবটিলিস’ শনাক্ত করেছেন। এই ব্যাকটেরিয়াটি কৃষি ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। বিশেষ ধরনের এই ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগে ধানে আর্সেনিক দূষণ এবং কৃষিজমিতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব বিস্তার রোখা যেতে পারে। ক্ষতিকারক সুপারবাগ হল এমন কিছু বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাক, যা চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। সাধারণ ওষুধ এদের ধ্বংস করতে পারে না, ফলে সামান্য সংক্রমণও মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী হতে পারে।
আরও পড়ুন:
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সুস্থ মাটিতে সচরাচর পাওয়া যায়, এমন এই পরিবেশ বান্ধব ব্যাকটেরিয়াটি ‘বায়োফিল্ম’ নামক এক ধরনের আঠালো আবরণ তৈরি করে। এই আবরণটি আর্সেনিককে আটকে ফেলে এবং সেটিকে ধানের শিকড়ে পৌঁছতে বাধা দেয়। এ ছাড়া এটি ‘সাবল্যান্সিন’ নামক প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিকের মতো এক ধরনের পদার্থও তৈরি করে, যা উপকারী অণুজীবের কোনোও ক্ষতি না করেই মাটির মধ্যে থাকা ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে।
আরও পড়ুন:
প্রতি বছর পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উত্তর প্রদেশের লক্ষ লক্ষ কৃষক অজান্তেই আর্সেনিক-দূষিত মাটিতে ধান চাষ করেন। বিজ্ঞানীরা কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে ব্যাসিলাস সাবটিলিসকে চিহ্নিত করেছেন। গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এই ব্যাকটেরিয়াটি কৃষিজমিতে উৎপাদিত ধানে আর্সেনিকের দূষণ কমাতে সাহায্য করে। এর বায়োফিল্ম আর্সেনিককে আটকে রাখে, ফলে ধান গাছের শিকড়ের মাধ্যমে এর শোষণ প্রতিরোধ করা যায়।
আরও পড়ুন:
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক-অধ্যাপক তড়িৎ রায়চৌধুরী, যিনি পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন এলাকার গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি জানান, গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলে কৃষিকাজের পরিস্থিতি এবং তার ফল যাচাই করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এই গবেষণার ফলাফল ‘জার্নাল অফ হ্যাজার্ডাস মেটেরিয়ালস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, বড় পরিসরে কৃষিক্ষেত্রে এর প্রয়োগের জন্য আরও গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।আরও পড়ুন:
এই গবেষণা টিমের রয়েছেন লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রধান গবেষক অর্ণব মজুমদার। অর্ণববাবুর কথায়, একই কৃষিজমির মধ্য দিয়ে ‘সুপারবাগ’ ছড়িয়ে পড়ছে। এই পৃথক দুটি সমস্যা মোকাবিলার জন্য একক ও প্রাকৃতিকভাবে সমাধান করা যায়। এই পদ্ধতিতে মাটিতে ‘সাবল্যান্সিন’ উৎপাদনের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে কাজ করে। এই প্রাকৃতিক সমাধানটি কোনো রাসায়নিক প্রয়োগ বা ক্ষতিকর কৃষি-পদ্ধতি ছাড়াই ব্যবহৃত হয়। ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এর কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া গবেষকরা আর্সেনিক আটকে রাখার ক্ষমতা হিসেবে ৭৪ শতাংশ বেশি কার্য ক্ষমতা লক্ষ্য করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের কৃষিক্ষেত্রের পরীক্ষায় প্রকৃত চাষাবাদের পরিস্থিতিতে এই লক্ষণগুলি নিশ্চিত করা গিয়েছে।আরও পড়ুন:
এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয় না। গবেষক অর্ণব মজুমদার আরও বলেন, প্রকৃতি নিজেই এই কৌশলটি তৈরি করে রেখেছে। আমরা কেবল সঠিক তাপমাত্রা ও সঠিক সময়ে এর ব্যবহার করার বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়েছি।
আরও পড়ুন:
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় এই ব্যাকটেরিয়াটি আরও বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে ৭৪ শতাংশের বেশি আর্সেনিক আটকে রাখা যায়। পাশাপাশি সর্বোচ্চ মাত্রায় ‘সাবল্যান্সিন’ উৎপাদন করা সম্ভব হয়। তাপমাত্রার এই পরিসরটি সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতে ৫ কোটিরও বেশি মানুষ আর্সেনিক-দূষিত ভূগর্ভস্থ পানির সংস্পর্শে রয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গ এর মধ্যে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল।