পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: ওমানে বাণিজ্যতরীতে মার্কিন হামলার ঘটনায় তিন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর ওমান উপকূলের কাছে আরও একটি ভারতীয় নাবিক বোঝাই জাহাজে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। গত চারদিনে পরপর দুবার ভারতীয় নাবিকদের জাহাজের উপর মার্কিন সামরিক হামলার ঘটনায় ভারত কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। গোটা ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে মার্কিন দূতকে ফের তলব করেছে বিদেশ মন্ত্রক। জানা গিয়েছে, অতিরিক্ত সচিবের তরফ থেকে মার্কিন ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক জেসন মিকসকে তলব করা হয়েছে। গত তিন দিনের মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার মার্কিন দূতকে ডেকে পাঠানো হলো। ভারত সরকার এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দাবি করেছে।

বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে জানা গেছে, ওমান উপসাগরে ইরানি তেল পরিবহনের অভিযোগে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে ভারতীয় নাবিকদের প্রাণহানি ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতেই মার্কিন কূটনীতিককে তলব করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ১০ জুন। ওই দিন পালাউয়ের পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ এমটি সেত্তেবেলো-তে মার্কিন হামলায় ২৪ জন ভারতীয় নাবিকের মধ্যে তিনজন প্রাণ হারান। বাকি ২১ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে ৮ জুন পালাউয়ের আরেকটি ট্যাঙ্কার এমটি মারিভেক্স-কে মার্কিন বাহিনী অচল করে দেয়। তবে ওই জাহাজে থাকা ২৪ জন ভারতীয় নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

এরপর বুধবার ওমানের শিনাস বন্দরের কাছে গিনি-বিসাউয়ের পতাকাবাহী এমটি জলবীর নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজেও হামলা চালানো হয়। জাহাজটিতে ২০ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত ছিলেন এবং পরে তাঁদের সকলকেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম দাবি করেছে, ইরানের বিরুদ্ধে জারি থাকা তেল রপ্তানি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এই জাহাজগুলি ইরানি তেল পরিবহনের চেষ্টা করছিল। জলবীরের ক্ষেত্রে সেন্টকম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করায় একটি যুদ্ধবিমান জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। একই অভিযোগে মারিভেক্স ও সেত্তেবেলোকেও অচল করে দেওয়ার দাবি করেছে তারা।

তবে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। ১০ জুন এক মন্ত্রকের ব্রিফিংয়ে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ভারত সরকার তার নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। এমটি সেত্তেবেলোর ওপর হামলার পর মার্কিন পক্ষের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং মার্কিন চার্জ ডি অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে গভীর উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

আন্তর্জাতিক আইন মেনে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশ মন্ত্রকের পাশাপাশি জাহাজ ও জলপরিবহন মন্ত্রকও পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে।

মন্ত্রক জানিয়েছে, ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রক, ভারতীয় নৌবাহিনী, বিদেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস, সংশ্লিষ্ট উপকূলীয় প্রশাসন, জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা এবং নাবিক কল্যাণ সংগঠনগুলির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সূত্রের খবর, বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে অন্তত ১৩টি জাহাজে প্রায় ৬২২ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত রয়েছেন। ফলে ওই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা যেভাবে বাড়ছে তা ভারতের কাছে একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-ব্যাঁ-এ হতে চলা জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের আলোচনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা। সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প-সহ বিশ্বের শীর্ষ নেতারা। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তা সেখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।