সেখ কুতুবউদ্দিনঃ নতুন সরকার আশার পর থেকেই ফুটপাথ, রেল স্টেশনে অবৈধভাবে চলা দোকানপাট বুলডোজার, হল্লাগাড়ির সাহায্যে তুলে দেওয়ার রেওয়াজ অব্যাহত রয়েছে। এই উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক বলে মনে করছে। তবে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দোকান চালিয়ে কোনও রকমে সংসার চালাচ্ছেন, তাদের কী হবে। কোনও বিকল্প ব্যবস্থাও করা হয়নি সংশ্লিষ্ট দফতরের তরফে। এই নিয়ে কেউ রোজগার হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। আবার কেউ রোজগার হারিয়ে হন্যে হয়ে ঘুরছেন, কিন্তু বিকল্প কাজ আর জোগাড় হচ্ছে না। শনিবার রাতে পার্ক সার্কাস প্ল্যাটফর্ম চত্বরে থাকা দোকানপাট তুলে দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে রবিবার পার্ক সার্কাস চত্বরে থাকা রাবিয়া খাতুন নামে এক দোকানদারের বক্তব্য, প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘদিন ধরে কচুড়ি বিক্রি করতাম। সেই কাজ হারিয়েছে। এ'ন কীভাবে রোজগার করব, ভেবে কুলকিনারা পারছি না। অন্য আর একজন দোকানদারের বক্তব্য, কিছু দিন আগে উঠে যেতে বলা হয়েছিল। প্ল্যাটফর্মে ১০৫টি দোকান ছিল। এর মধ্যে ৩টি দোকান রাখা হয়েছে। কারণ তারা আগাম আদালতে আবেদন করেছিল। একইরকমভাবে দোকান আমরা দিয়েছিলাম। আমাদের তুলে দেওয়া হয়েছে।
রবিবার সারাদিন ঘুরেও একটা রোজগার করতে পারিনি। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট বাচ্চা রয়েছে, তাদের কী খাওয়াব। লক্ষ্মী ভাণ্ডার ছিল, সেটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার পাব না কী জানি না। স্বামীও তেমন কিছু করতে পারে না।আরও পড়ুন:
এদিকে কলকাতার একাধিক জায়গায় কলকাতা পুরসভা ও রেল কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ-এর নোটিশ দিয়েছে। কিন্তু যাদের দোকান রয়েছে, তাদের কোনও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। তাঁরা কীভাবে নিজেদের সংসার সামলাবেন। এই রাজ্য বা শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই।
আরও পড়ুন:
রাত ত'ন সাড়ে এগারোটা। পার্ক সার্কাস স্টেশন চত্বর ও চার নম্বর ব্রিজের উপর কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রেল পুলিশ ঘিরে রেখেছে। দেখেই অনেকেই মন্তব্য, ‘বুলডোজার’ অভিযান হবে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা কী করতে পেরেছে। যাদের দোকানপাট ভাঙছে, তারা কী দেশের মানুষ নয়, তাদের নিয়ে কী কোনও চিন্তাভাবনা হবে না? এই প্রশ্ন অনেকেই করছেন। শনিবার মাঝরাতে অভিযান চালিয়ে ভেঙে, গুঁড়িয়ে দেওয়া হল ‘অবৈধ’ দোকান-স্টল।
রেলের জমি দখলমুক্ত করতে এবং যাত্রী সুবিধার জন্যই এই পদক্ষেপ বলে জানিয়েছেন পূর্ব রেল কর্তৃপক্ষ। তবে এই নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করতে চাননি প্রশাসনের আধিকারিকরা।আরও পড়ুন:
শিয়ালদহ ডিভিশনের অন্যতম ব্যস্ত স্টেশন পার্ক সার্কাস। প্রতিদিন নিত্যযাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু স্টেশনের ভিতরে ও বাইরে রেলের জমিতে ব্যাঙের ছাতার মতো অবৈধ দোকান গজিয়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, কয়েকটি জায়গায় রীতিমতো পাকা স্টল বানিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠছিল দীর্ঘদিন ধরে। এই নিয়ে ক্ষোভ ছিল নিত্যযাত্রীদের মধ্যেও।
আরও পড়ুন:
ওই দিন পার্ক সার্কাস স্টেশন চত্বর-সহ গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ এবং আরপিএফ। লাগিয়ে দেওয়া হয় ব্যারিকেড। প্রথমে মাইকিং করে রেলের জমি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ সময়ও দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের। কিন্তু স্টেশন চত্বরের ব্যবসায়ীদের কেউই নিজে থেকে এগিয়ে এসে দোকান সরিয়ে নেননি বলে অভিযোগ। এর পরেই নামে বুলডোজার। একের পর এক ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ‘অবৈধ’ দোকান, স্টল, গুমটি। রাজ্যে পালাবদলের পরে রেলের জমি দখলমুক্ত করতে শুরু হয়েছে উচ্ছেদ অভিযান। চলতি মাসের শুরুতে পার্ক সার্কাস স্টেশন চত্বরের দোকানদার এবং ব্যবসায়ীদেরও নোটিশ পাঠানো হয়েছিল বলে সূত্রের খবর।
জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এলাকা খালি করে দিতে হবে। কিন্তু তার পরেও কেউ স্টল বা দোকান সরিয়ে নিয়ে যাননি বলে অভিযোগ।আরও পড়ুন:
উচ্ছেদের সময় পুলিশ প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট বলে দেওয়া হচ্ছিল, ‘প্রশাসনের কাজে বাধা দিলে ফল ভুগতে হবে।’ অবশ্য নির্বিঘ্নেই উচ্ছেদ অভিযান চলে।
আরও পড়ুন:
এর আগেও নোটিশ জারি করে হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনের পাশাপাশি দমদম, হাবরা, যাদবপুরেও অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে রেল। তবে দোকানদারদের একাংশের অভিযোগ, এভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো বেআইনি। আদতে তাঁদের রুটিরুজি কেড়ে নেওয়া হল। স্টেশন চত্বর থেকে অবৈধ দোকান সরিয়ে দেওয়ায় যাত্রীদের একাংশ জানায়, এর ফলে স্টেশন চত্বরে চলাফেরায় সমস্যা কমবে।
আরও পড়ুন:
রবিবার ইস্টার্ন রেলওয়ের চিফ পাবলিক রিলেশন অফিসার শিবরাম মাজি পুবের কলমকে জানান, রেলের স্টেশনগুলি রাজ্য সরকারের জায়গায় রয়েছে। রাজ্য সরকার রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে উচ্ছ্বেদ করছে। তবে এই উচ্ছ্বেদ প্রয়োজন ভিত্তিক বলে জানান তিনি। শিবরাম মাজি বলেন, রেলের জমিতে বেআইনিভাবে জবর দখল থাকতে পারে না। কারণ, এতে মানুষের যাতায়াতের অসুবিধা হচ্ছে। তা ছাড়া রেলের অধীনে জমি বা প্লার্টফর্মে বিভিন্ন কর্মসূচীর উদ্যোগ নেওয়া হয়। জমি বেদখল থাকার ফলে তৎক্ষনাৎ কাজ শুরু করা সম্ভব হয়। তবে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে অসুবিধা হচ্ছে। সেটা আধিকারিকরা বুঝছেন। বিকল্প হিসাবে রাজ্য সরকার চিন্তা ভাবনা করবে।