উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : বাঘের আক্রমণে গুরুতর আহত মৎস্যজীবীর ‘ব্রেন ডেথ’ হওয়ার পর তাঁর অঙ্গদান করলো পরিবার। মঙ্গলবার কলকাতার পিজি হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে চিকিৎসাধীন ৩৬ বছরের আজিত মোল্লার অঙ্গদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রত্যন্ত সুন্দরবনের স্বল্পশিক্ষিত এক মৎস্যজীবী পরিবারের এই সিদ্ধান্তকে মানবিকতার এক অনন্য নজির হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।কুলতলির মৈপীঠের নগেনাবাদ এলাকার বাসিন্দা আজিত মোল্লা।গত ২সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের হামলার শিকার হন তিনি। বাঘের মুখ থেকে সহ মৎস্যজীবীরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে জয়নগর-কুলতলি গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান।

কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় ওই দিনই তাঁকে কলকাতার এসএসকে এম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই ভেন্টিলেশনে ছিলেন তিনি।কয়েক দিন ধরে চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও আজিতের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয় নি। সোমবার চিকিৎসকেরা তাঁর পরিবারের সদস্যদের অঙ্গদানের প্রস্তাব দেন। পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রথমে অঙ্গদানে সম্মতি জানালে ও আজিতের স্ত্রী তাতে রাজি ছিলেন না।পরে মৎস্যজীবিদের সবসময় পাশে থাকা এপিডিআরের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সহ-সম্পাদক মিঠুন মণ্ডল আজিতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে লাগাতার কথা বলেন।
অঙ্গ দানের গুরুত্ব ও এর মাধ্যমে অন্য মানুষের জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন তিনি।শেষ পর্যন্ত আজিতের স্ত্রীও অঙ্গদানের সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করতে রাজি হন। মঙ্গলবার সকালে পিজি হাসপাতালে অঙ্গদানের প্রয়োজনীয় নথি জমা পড়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অঙ্গগ্রহীতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর নিয়ম মেনে অঙ্গদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।আজিত মোল্লার পরিবারে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী এবং চার কন্যা সন্তান। সুন্দরবনের পশ্চাদপদ এলাকার এই পরিবার এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও অঙ্গদানের মতো মহৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে তাঁদের প্রশংসা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি পরিবারের এই সিদ্ধান্ত মানবিকতার এক বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।অঙ্গদান প্রক্রিয়ায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাঁদের বোঝানোর ক্ষেত্রে এপিডিআরের জেলা সহ-সম্পাদক মিঠুন মণ্ডলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলেও দাবি সংগঠনের।তবে আজিতের পরিবারের এই মানবিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বন দফতরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ, বাঘের হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পরও এখনও পর্যন্ত আজিতের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সরকারি ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বন দফতর যথাযথ উদ্যোগ নেয়নি। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার একজন মৎস্যজীবী পরিবার এমন মহৎ কাজে এগিয়ে এলেও তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে বলে অভিযোগ।ফলে একদিকে আজিত মোল্লার পরিবারের অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত যেমন মানবিকতার নজির তৈরি করেছে, অন্যদিকে বাঘের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এই পরিবারের পাশে প্রশাসন ও বন দফতর কবে দাঁড়াবে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে চলে এসেছে ।