উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিকতার দৃষ্টান্তও তৈরি করলেন এক পুলিশ আধিকারিক। নিজের জন্মদিনের আনন্দকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অনাথ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন ঘুটিয়ারি শরীফ থানার ওসি তুহিন মণ্ডল। নিজের এক বছর আট মাসের ছোট্ট সন্তান তৃষানকে সঙ্গে নিয়ে ঘুটিয়ারি শরীফ অনাথ শিশু শিক্ষা আশ্রমে গিয়ে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে জন্মদিন পালন করলেন তিনি।তুহিন মণ্ডলের জন্মদিন আবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনের দিনেই। এবারের জন্মদিনে অন্যরকমভাবে দিনটি কাটানোর ইচ্ছে ছিল তাঁর। সেই ভাবনা থেকেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আচমকাই ঘুটিয়ারি শরীফ অনাথ শিশু শিক্ষা আশ্রমে পৌঁছে যান তিনি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছোট্ট সন্তান তৃষান এবং কয়েকজন সহকর্মী।পুলিশ আধিকারিককে আশ্রমে দেখে শিশুদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ।জন্মদিন উপলক্ষে আশ্রমের শিশুদের হাতে খাতা, পেন, পেন্সিল, ড্রয়িং খাতা, চকোলেট-সহ বিভিন্ন সামগ্রী তুলে দেন ওসি।

পাশাপাশি শিশুদের জন্য টিফিনেরও ব্যবস্থা করেন তিনি। কেক কেটে শিশুদের সঙ্গে জন্মদিনের আনন্দ ভাগ করে নেন।শুধু উপহার দেওয়াই নয়, এদিন আশ্রমের শিশু এবং সেখানে থাকা সকলের সারা দিনের আহারের দায়িত্বও নেন তিনি।বেশ কয়েক মাস আগে বারুইপুর থানা থেকে ঘুটিয়ারি শরীফ আউটপোস্টের ওসি হিসেবে দায়িত্ব নেন তুহিন মণ্ডল।এর আগে ওই আউটপোস্টেই সাব-ইনস্পেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বারুইপুর পুলিশ জেলার জয়নগর, ক্যানিং,জীবনতলা, বারুইপুর সহ একাধিক থানাতে ও কাজ করেছেন এই পুলিশ আধিকারিক।নিজের জন্মদিনে ছোট্ট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে অনাথ আশ্রমে এসে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর এই উদ্যোগকে মানবিক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে জানিয়েছেন আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা হাসিবুর রহমান। তাঁর বক্তব্য, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে সহানুভূতি, মানবিকতা এবং অন্যের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন। সেই ভাবনাকে সামনে রেখেই তুহিন মণ্ডল তাঁর ছোট্ট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আশ্রমে এসেছেন।
ঘুটিয়ারি শরীফ অনাথ শিশু শিক্ষা আশ্রমে সমাজের নানা প্রতিকূলতার কারণে সুবিধাবঞ্চিত এবং পিতা মাতাহারা শিশুদের আশ্রয় দিয়ে তাঁদের শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা চলছে।আশ্রম সূত্রে জানা যায়, একসময় এই শিশুদের কেউ ঘুটিয়ারি শরীফ রেল স্টেশনে ভিক্ষা করত, কেউ খাবারের জন্য মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরত। অনেকের জীবনেই ছিল অবহেলা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা। বর্তমানে আশ্রমের পরিবেশে থেকে সেই শিশুরাই পড়াশোনা করছে এবং ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছে।আশ্রমের ইনচার্জ সারকিয়া বিবি ও সেরিনা বিবি প্রতিদিন শিশুদের দেখভাল করেন।তাঁদের স্নান করানো,দাঁত মাজানো, পড়াশোনায় বসানো, স্কুলে পাঠানো থেকে শুরু করে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ানো—সবকিছুই তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে করে চলেছেন।
সারকিয়া বিবির কথায়, “এদের অনেকেরই বাবা-মা নেই। তাই বাবা-মায়ের অভাব ও দুঃখযেন তারা অনুভব না করে,সেই চেষ্টা করি।নিজেদের সন্তানের মতোই তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছি।

জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আশ্রমের শিশুরা নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি কবিতা শোনায় এবং ওসি তুহিন মণ্ডলকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়। শিশুদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে ছোট্ট তৃষানও।এখন ও ঠিকমতো কথা বলতে বা হাঁটতে না পারলেও বাবার হাত থেকে উপহার নিয়ে একে একে আশ্রমের শিশুদের হাতে তা তুলে দেয় সে। ছোট্ট তৃষানের এই সরল উপস্থিতি অনুষ্ঠানের মুহূর্তকে আরও আবেগঘন করে তোলে।এদিন ওসি তুহিন মণ্ডলের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এএসআই সোমনাথ দাস, দীপক মাহাতো, মইদুল ইসলাম, অমিত-সহ অন্যান্যরা।
এ বিষয়ে ওসি তুহিন মণ্ডল বলেন, “নিজের জন্মদিনটা এইভাবে কাটাতে পেরে এবং ওদের পাশে থাকতে পেরে খুব ভালো লাগছে। জন্মদিনের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পেরে আমি আনন্দিত।”
নিজের জন্মদিনের আনন্দকে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার এই উদ্যোগে পুলিশের অন্য এক মানবিক মুখ সামনে এসেছে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই প্রয়াস ঘুটিয়ারি শরীফ এলাকায় প্রশংসা কুড়িয়েছে।