সুবিদ আবদুল্লাহ্, মুর্শিদাবাদ: নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার নামে নতুন করে মিথ্যা প্রচার শুরু হয়েছে। নবাবকে অযোগ্য ও নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে নতুন করে প্রচার চলছে। অপর দিকে নবাবকে ক্ষমতাথেকে এবং দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবার ষড়যন্ত্রকারীদের নায়ক বানিয়ে প্রচার চলছে। এই অপপ্রচারের প্রতিবাদে সরব হল নবাব সিরাজ-উদদৌলা স্মৃতি সুরক্ষা ট্রাস্ট। ট্রাস্টের নেত্রী সমর্পিতা দত্ত এদিন দাবি করেন, নবাবের বিরুদ্ধে মূল ষড়যন্ত্রকারী জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, উমিচাঁদ, মীরজাফরদের মত দেশবিরোধীদের নায়কের আসনে বসানো হচ্ছে। এই অপপ্রচার রুখে দিতে হবে আমাদের। হিন্দু মুসলিমের যৌথ উদ্যোগে এই কাজ বন্ধ করতে হবে বলে তিনি সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান করেন। 

এদিন ছিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদদৌলার ২৭০তম শাহাদাত বরণ দিবস। প্রতি বছরের মত এ বছরও নবাব সিরাজের অনুগামীরা শ্রদ্ধা ও জিয়ারতের জন্য ভিড় করেছিলেন নবাব কবরে।   খোসবাগে প্রবেশ করে দেখা গেল, নবাবের সিরাজের কবরের সামনে বসে আছেন আদিনা খাতুন।

তাঁর কাছে জানাগেল, নবাবের প্রত্যেক আত্মীয়ের কবরে ফুল সাজিয়েছেন ট্রাস্টের নেত্রী সমর্পিতা দত্ত। নবাব সিরাজ ও তাঁর প্রত্যেক আত্মীয়ের মাটির বিছানাটি সুচারুভাবে ফুলে ফুলে সাজানো। তা দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে। আস্তে আস্তে মানুষ আসতে দেখা গেল। নবাবের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে তাঁরা এসেছেন। জানা গেল, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার জন্য এবারে আসতে পারেননি বাংলাদেশ ও পাকিস্থানের মানুষ। তবে, পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্ত থেকে অগনিত মানুষ এসেছিলেন শুধুমাত্র নবাব সিরাজ-উদদৌলার টানে।

জিয়ারত ও শ্রদ্ধা জানানোর পর খোসবাগ স্মৃতিসৌধের সামনে নবাব সিরাজের শাসন ও আত্মবলিদান নিয়ে আলোচনাসভা করা হয়। আলোচানায় অংশ নেন নবাব সিরাজ-উদদৌলা স্মরণ সমিতির সভাপতি বিপ্লব বিশ্বাস, শিক্ষাবিদ সামসুল হালসানা ও আফতাবউদ্দিন, ইতিহাস গবেষক আলিমুজ্জমানা, হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলনের নেত্রী সমাজকর্মী সমর্পিতা দ্ত্ত, নারকেল বাগান মুনলাইট ইনস্টিটিউট ছাত্রছাত্রী ও কলকাতা থেকে নেতাজি অনুসারি আজাদ হিন্দ বাহিনী ছাত্রছাত্রীরা। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, বিশিষ্টকবি রেজাউল করিম, শিক্ষাবিদ মোসারফ হোসেন, সমাজসেবি সন্তোষ চ্যাটার্জি, সামসুজ্জোহা বিশ্বাস, আকবর আলি, খলিলুর রহমান, কবি সমরেন্দ্র ভট্টাচার্য, চিত্রগ্রাহক বদরুদ্দোজা, কবি মুস্তাফিজ জামান, মুজিবুর রহমান প্রমুখ।

বক্তব্য রাখতে গিয়ে নবাব সিরাজ-উদদৌলা স্মরণ সমিতির সভাপতি বিপ্লব বিশ্বাস জানান, নবাব সিরাজ সেদিন অপপ্রচারে বিদ্ধ হয়েছিলেন ইংরেজ সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে। এই অপপ্রচার রোধ করতে নেতাজি ১৯৪০ সালে আসেন মুর্শিদাবাদে। খেসবাগে নবাব সিরাজের কবরে ফুল রেখে, সভা করে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। আজ আবারও নতুন করে অপপ্রচার শুরু হয়েছে। আমরা নেতাজির ভাবধারায় বিশ্বাসীরা এই প্রচারের রুখে দাঁড়ানোর শপথ করছি। নবাব সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে অপপ্রচার রুখে দিতে আমরা জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলব।

নবাব সিরাজ-উদদৌলা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রখ্যাত ইতিহাস গবেষক আলিমুজ্জমান দাবি করেন, খোসবাগ কবরস্থানের প্রতিটি কবরে নাম ফলক দেওয়া হোক। এখানে নবাব সিরাজের কবর ছাড়া আর কোনও কবরে নাম ফলক নেই। এ ছাড়া নবাব সিরাজের একমাত্র স্মৃতি হীরাঝিল প্রসাদের অধিকাংশ তলিয়ে গেছে গঙ্গাগর্ভে। বাকি অংশ আগাছার জঙ্গলে ঢেকে ছিল।

সেটি জঙ্গল মুক্ত করে স্থানটিকে পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার জন্য আলিমুজ্জমান সমাজকর্মী সমর্পিতা দত্তকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। 

তিনি বলেন, নেতাজির নামে কলঙ্ক প্রচারের মূলচক্রী ছিল ইংরেজগণ। এই অপপ্রচার রুখে দিতে প্রথম রাস্তায় নামেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন 'দৈনিক আজাদ' সম্পাদক মওলানা আক্রাম খাঁ ও কবি কাজি নজরুল ইসলাম। মুর্শিদাবাদ সফর শেষে কলকাতায় ফিরে কাজি নজরুল ২৯ জুন দৈনিক আজাদ ও মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় বিবৃতিতে বলেছিলেন, 'বিদেশীর বন্ধন-শৃঙ্খল হইতে মুক্তি লাভের জন্য আজ আমরা সংগ্রামে রত। সিরাজের জীবনস্মৃতি হইতে যেন আমরা অনুপ্রাণিত হই। ইহাই আমার প্রার্থনা।‘ আমরা নেতাজি নজরুলের ভাবনায় বিশ্বাসী। আমাদের আবারও রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।

দিনটিকে শহিদ দিবস পালন করার প্রস্তাব আনা হয়। এ  ছাড় দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে নবাব সিরাজের স্মৃতিতে কয়েকশ চারাগাছ তুলে দেওয়া হয় উপস্থিত প্রত্যেকের হাতে। এর পাশাপাশি উপস্থিত সবার জন্য স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করা হয়।