পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: ভারতের রাজনৈতিক ও আইনি ইতিহাসের অন্যতম চর্চিত বোফর্স মামলার চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটল সুপ্রিম কোর্টে। ২০০৫ সালে দিল্লি হাই কোর্ট সুইডিশ অস্ত্র নির্মাতা সংস্থা ও হিন্দুজা ভাইদের বিরুদ্ধে এই মামলা খারিজ করে দিয়েছিল। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৮ সালে শীর্ষ আদালতে নতুন করে মামলা দায়ের করেছিল সিবিআই। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সেই আর্জি খারিজ করে দিয়ে কয়েক দশকের পুরনো এই বিতর্কিত মামলার চিরতরে ইতি টানল।

শীর্ষ আদালতের বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চে এই আবেদনটি পুনরায় শুনানির জন্য পেশ করেছিলেন আইনজীবী অজয় কে আগরওয়াল। শুনানিপর্বে আবেদনপত্র থেকে প্রয়াত দুই ভাই শ্রীচাঁদ পি হিন্দুজা ও গোপীচাঁদ পি হিন্দুজার নাম বাদ দেওয়ার জন্য তিনি আদালতের কাছে চার সপ্তাহ সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু দুই বিচারপতির বেঞ্চ এর জন্য অতিরিক্ত সময় দিতে সরাসরি অস্বীকার করে এবং সাফ জানিয়ে দেয় যে এই মামলাটিকে আর কোনওভাবেই দীর্ঘায়িত করা সম্ভব নয়। এর ফলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার সব রকম আইনি প্রচেষ্টার সমাপ্তি ঘটে।


প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালের ৩১ মে এক যুগান্তকারী রায়ে দিল্লি হাই কোর্ট শ্রীচাঁদ, গোপীচাঁদ ও প্রকাশ হিন্দুজা-সহ এবি বোফোর্সকে সমস্ত ফৌজদারি অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। সেই সময় আদালত জানিয়েছিল যে, ১৯৮৬ সালের কামান চুক্তিতে হিন্দুজা ভাইদের সরাসরি কোনও ভূমিকা বা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে সিবিআই।

 প্রসিকিউশনের তরফে পেশ করা সাক্ষ্যপ্রমাণে গুরুতর গলদ রয়েছে বলেও হাই কোর্ট অভিমত প্রকাশ করেছিল।
ঐতিহাসিক এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় ১৯৮৬ সালের ১৮ মার্চ, যখন সুইডেনের অস্ত্র নির্মাণকারী সংস্থার সঙ্গে ভারতের ১৪৩৭ কোটি টাকার একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী ভারতের চারশোটি ১৫৫ এমএম হাউইৎজার কামান কেনার কথা ছিল। কিন্তু ঠিক তার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৭ সালের এপ্রিলে একটি সুইডিশ রেডিও চ্যানেল দাবি করে যে, এই চুক্তির জন্য ভারতের একাধিক রাজনীতিবিদ এবং প্রতিরক্ষা আধিকারিকদের বিপুল অঙ্কের কমিশন দেওয়া হয়েছে। এরপর ১৯৯০ সালের ২২ জানুয়ারি সিবিআই বোফর্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মার্টিন আরবডো, মধ্যস্থতাকারী উইন চাড্ডা এবং হিন্দুজা ভাইদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ষড়যন্ত্র, জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে এফআইআর দায়ের করে।

এই ঘটনার জেরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর গায়েও কলঙ্কের দাগ লেগেছিল। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে কখনও কোনও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত তাঁকে নির্দোষ বলেও ঘোষণা করে। অন্যদিকে, কার্গিল যুদ্ধে এই বোফর্স কামানই ভারতের জয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল, কারণ মাত্র ১২ সেকেন্ডে ৩ রাউন্ড গোলা ছুড়তে সক্ষম এই কামান শত্রুপক্ষকে কার্যত কোণঠাসা করে দিয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক মহলে এই ইস্যুটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশে দীর্ঘকাল ধরে চলা এই অধ্যায়ের পাকাপাকি সমাপ্তি ঘটল।