প্রায় এক মাসের টানাপড়েনের পর অবশেষে ছর্‌রা-কাণ্ডে এফআইআর দায়ের করতে সম্মত হল দিল্লি পুলিশ। শুক্রবার আক্রান্ত সাহিল লোছাবকে সঙ্গে নিয়ে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর অবস্থান-বিক্ষোভের পরই এই সিদ্ধান্ত আসে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সাহিলের অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ১১৮ এবং ১২৫ ধারায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এফআইআরে নির্দিষ্ট করে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।
রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ‘সম্মতি’র পরেই পুলিশ এফআইআর দায়ের করেছে। যদিও এই দাবি নিয়ে কেন্দ্র বা দিল্লি পুলিশের তরফে পৃথক কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২০ জুলাই। দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের সময় ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ছর্‌রা গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। তবে দিল্লি পুলিশ ও প্রশাসন প্রথম থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। ওই ঘটনায় আক্রান্ত সাহিল লোছাবের পাশে দাঁড়িয়ে শুরু থেকেই সরব ছিলেন রাহুল গান্ধী।


শুক্রবার সাহিলকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে মন্দির মার্গ থানায় যান রাহুল। সেখানে ছর্‌রা-কাণ্ডে এফআইআর দায়ের করার দাবি জানানো হয়। অভিযোগ, সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় পরে তাঁরা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যান। সেখানে ডিসিপি সেন্ট্রাল শচীন শর্মার সঙ্গে দেখা করেও এফআইআর দায়েরের আর্জি জানান রাহুল ও সাহিল। কিন্তু সেখানেও সমাধান না মেলায় থানার সামনে অবস্থানে বসেন রাহুল।
এর পর তাঁর সঙ্গে ধর্নায় যোগ দেন প্রিয়ঙ্কা গান্ধী, জয়রাম রমেশ-সহ কংগ্রেসের একাধিক নেতা-কর্মী। রাহুল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এফআইআর দায়ের না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা অবস্থান চালিয়ে যাবেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ মামলা দায়ের করে।
কংগ্রেসের দাবি, ছর্‌রা-কাণ্ড নিয়ে সাহিল এর আগে ১৪ অগস্ট এবং পরে ১৭ অগস্ট পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তখনও কোনও এফআইআর দায়ের হয়নি।
শুক্রবার সেই সাহিলকেই সঙ্গে নিয়ে থানায় পৌঁছন রাহুল।

১৯ বছরের সাহিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওপেন লার্নিংয়ের ছাত্র। পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি গাড়ি চালিয়ে উপার্জন করেন তিনি। তাঁর বাবা-ও গাড়ি চালান। ভবিষ্যতে দিল্লি পুলিশে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে সাহিলের। সেই লক্ষ্যেই কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।

২০ জুলাই নিট দুর্নীতির প্রতিবাদে ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন সাহিল। তাঁর অভিযোগ, সেখানেই তাঁকে লক্ষ্য করে ছর্‌রা ছোড়া হয়। ঘটনায় তাঁর একটি চোখের প্রায় ৯৯ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রাথমিক ভাবে ছর্‌রা গুলিতে পাঁচ জন আহত হওয়ার খবর সামনে এসেছিল।

আহতদের মধ্যে ছিলেন শেখ ইরশাদ মনসুরি, নূতন টোপ্পো, প্রশান্ত সিংহ, সাহিল লোছাব এবং একটি ইংরেজি সংবাদপত্রের এক সাংবাদিক। পরে আরও কয়েকজনের আহত হওয়ার তথ্য সামনে আসে। সব মিলিয়ে অন্তত ১০ জন ছর্‌রা গুলিতে জখম হয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
ছর্‌রা গুলি সাধারণত প্রাণঘাতী না হলেও শরীরে অসংখ্য ক্ষত তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চোখে ছর্‌রা লাগলে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অতীতে কাশ্মীরে বিক্ষোভ দমনে ছর্‌রা ব্যবহারের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। এ বার দিল্লিতে প্রতিবাদীদের লক্ষ্য করে একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের ধর্নার পর শেষ পর্যন্ত মামলা দায়ের হওয়ায় এখন তদন্তের দিকেই নজর। এফআইআরে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে ছর্‌রা গুলি কোথা থেকে এবং কার নির্দেশে ছোড়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পালা শুরু হল।