মানুষ যুগ যুগ ধরে অমরত্বের স্বপ্ন দেখে এসেছে। পুরাণ এবং সাহিত্য থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণায় মৃত্যুকে জয় করার প্রবল আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান। কিন্তু পৃথিবীর বুকেই এমন এক প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে, যা বার্ধক্য বা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে নিজের জীবনচক্রকে উল্টে দিয়ে পুনরায় শৈশবে ফিরে যেতে সক্ষম। বিজ্ঞানীদের কাছে সেই বিস্ময়কর প্রাণীর নাম টুরিটোপসিস ডোর্নি (Turritopsis dohrnii), যা অমর জেলিফিশ নামেই বিশ্বজুড়ে বেশি পরিচিত।
আরও পড়ুন:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক মারিয়া পিয়া মিগলিয়েত্তার মতে, প্রতিকূল পরিবেশে এই অমর জেলিফিশের আচরণ অন্যান্য সব প্রাণী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। জলের অতিরিক্ত তাপমাত্রা, খাদ্যের অভাব, রাসায়নিক দূষণ, এমনকি শরীর কেটে গেলেও সাধারণ জেলিফিশের মতো এদের মৃত্যু হয় না।
বরং তারা আবারও নতুন করে জীবনের অধ্যায় শুরু করে। অমর জেলিফিশ হওয়ার প্রক্রিয়ায় তাদের এই অদ্ভুত ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের বারবার অবাক করেছে।আরও পড়ুন:
সাধারণ জেলিফিশের জীবনচক্রে প্রথমে লার্ভা, পরে পলিপ এবং সেখান থেকে পূর্ণবয়স্ক মেডুসা দশা আসে, আর প্রজননের পর ধীরে ধীরে তাদের মৃত্যু হয়। কিন্তু টুরিটোপসিস ডোর্নি সেই স্বাভাবিক নিয়ম মানে না, কারণ বিপদ দেখা দিলেই তারা পূর্ণবয়স্ক অবস্থা থেকে আবারও পলিপ পর্যায়ে ফিরে যায়। এরপর নতুন করে বেড়ে ওঠে, যেন সদ্য আবার জন্ম নিল। বিজ্ঞানীরা এই বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন সেলুলার ট্রান্সডিফারেনশিয়েশন।
এতে শরীরের একটি কোষ অন্য ধরনের কোষে রূপান্তরিত হতে পারে। এরপর জেলিফিশটি প্রথমে ছোট একটি গোলকের মতো হয়ে যায় এবং মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেই অবস্থা থেকে নতুন পলিপ তৈরি হয়। এদের জিনগত বৈশিষ্ট্যও থাকে একই রকম।আরও পড়ুন:
গবেষণাগারে এই অমর জেলিফিশকে অনির্দিষ্টকাল বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তবে প্রকৃতিতে শিকারি প্রাণীর আক্রমণে তাদের মৃত্যু হতে পারে। অর্থাৎ বার্ধক্যে নয়, বাইরের কারণে জীবন শেষ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বিশ্বজুড়ে টুরিটোপসিস-এর আটটি স্বীকৃত প্রজাতি রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কেবল টুরিটোপসিস ডোর্নিই বারবার জীবনচক্রে ফিরে যাওয়ার এই অসাধারণ ক্ষমতার জন্য পরিচিত। আকারে মাত্র কয়েক মিলিমিটার হলেও ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর, জাপানের উপকূল, পানামা ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন সামুদ্রিক অঞ্চলে এই ক্ষুদ্র অমর জেলিফিশ টিকে রয়েছে।আরও পড়ুন:
জেলিফিশ বিশেষজ্ঞ জীববিজ্ঞানী ড. লিসা অ্যান গার্শউইনের মতে, মানুষের অমরত্বের স্বপ্ন বহু প্রাচিন। অথচ সেই ক্ষমতার সবচেয়ে বিস্ময়কর উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে এক ক্ষুদ্র প্রাণীর মধ্যে। এই প্রাণীর পুনর্জন্মের ক্ষমতাই তাকে প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময় করে তুলেছে। প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী তাই শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়ই নয়। বার্ধক্য, কোষের পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে ভাবাচ্ছে বিশ্বকে।