উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়নগর : কৃষিজমির উর্বরতা রক্ষা, মাটির স্বাস্থ্য বজায় রাখা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করতে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ‘ক্ষেত বাঁচাও অভিযান’। ভারত সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের উদ্যোগে এই বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের স্বনির্ভর করে তোলার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। ২২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান চলবে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এই কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় কৃষকসভা ও সচেতনতামূলক শিবিরের আয়োজন করা হচ্ছে।বৃহস্পতিবার এই অভিযানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর-২ ব্লকের রাধাকান্তপুর গ্রামের শ্রী দুর্গা ক্লাব প্রাঙ্গণে।এদিনের আয়োজিত আলোচনা সভায় ব্লকের বহু কৃষক অংশগ্রহণ করেন।

কৃষিজমির গুণমান রক্ষা, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং কম খরচে টেকসই পদ্ধতিতে চাষাবাদের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন উপস্থিত কৃষি বিশেষজ্ঞরা।এদিন নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সংস্থার বর্ষীয়ান বিজ্ঞানী ও প্রধান ড. চন্দন কুমার মণ্ডল, কৃষি বিজ্ঞানী ড. দীপক কুমার রায়, ড. সোমনাথ সরদার, ড. অরিত্র সরকার এবং শ্রীমতী সূচন্দ্রা নিয়োগী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বৃন্দাবন গায়েন, শ্রী দুর্গা ক্লাবের সভাপতি সুশীল নিয়োগী-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।এদিন 
আলোচনা সভায় কৃষি বিজ্ঞানীরা মাটির স্বাস্থ্য ও গুণমান বজায় রাখার উপরে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁরা জানান, দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন বজায় রাখতে হলে জমির উর্বরতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার সাময়িকভাবে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করলেও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাভাবিক গুণমান এবং ভূগর্ভস্থ জলের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এর পাশাপাশি পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও ক্ষতিকর প্রভাব দেখা দিতে পারে।এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি গ্রহণের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ‘সয়েল টেস্ট’-এর মাধ্যমে জমির পুষ্টিগুণ ও প্রয়োজনীয় উপাদান সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিয়ে সার প্রয়োগের উপরেও জোর দেওয়া হয়।তাঁদের মতে, জমির প্রয়োজন অনুযায়ী সার ব্যবহার করলে যেমন চাষের খরচ কমানো সম্ভব, তেমনই মাটির স্বাভাবিক উর্বরতাও দীর্ঘদিন বজায় রাখা যায়।
এদিনের সভায় ফসল কাটার পর জমিতে পড়ে থাকা অবশিষ্টাংশ না পুড়িয়ে তা দিয়ে কম্পোস্ট সার তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়। কৃষিজ বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জমির পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি এবং চাষের খরচ কমানোর বিভিন্ন উপায়ও কৃষকদের সামনে তুলে ধরেন বিজ্ঞানীরা।
বিশেষজ্ঞ দের মতে,কৃষির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে শুধু বেশি পরিমাণে ফসল উৎপাদনের দিকে নজর দিলেই চলবে না। একই সঙ্গে জমির স্বাস্থ্য, মাটির স্বাভাবিক গুণমান এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখাও অত্যন্ত প্রয়োজন।কারণ, বর্তমানে কৃষিজমির যথাযথ সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও উর্বর জমি ও নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে।কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষকদের মধ্যে এই ধরনের আলোচনা এবং মতবিনিময় চাষাবাদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক ও পরিবেশ বান্ধব কৃষিপদ্ধতির প্রসার ঘটলে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও টেকসই করে তোলা সম্ভব হবে। ‘ক্ষেত বাঁচাও অভিযান’-এর মাধ্যমে সেই লক্ষ্যেই কৃষকদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।