ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। সেই আন্দোলনে অনেকের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় একটি অদ্ভুত স্লোগান—‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’-র অর্থ ‘আল্লাহর নামে শুরু’, আর ফরাসি বাক্যাংশটির অর্থ ‘এটি অন্ধকার’। দুই ভাষার মিশেলে তৈরি এই স্লোগান ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা।

কীভাবে স্লোগানটির উৎপত্তি?

ধারণা করা হয়, স্ন্যাপচ্যাটে প্রকাশিত একটি বার্তা থেকেই স্লোগানটির সূত্রপাত। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা চলার সময় বার্তাটি পাঠানো হয়। বার্তার শুরুতে ছিল ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ এবং পরে লেখা হয়, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব’।

মামাদৌ ও আবদুল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে একাধিকবার বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। বার্তাটিকে অনেকেই হাস্যকর মনে করে স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তারা বার্তাগুলোর মূল উৎস যাচাই করতে পারেনি।

ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানে পরিণত হলো কীভাবে?

অনেক তরুণের সন্দেহ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কেউ শিক্ষার্থী আন্দোলনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে এই বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, তরুণদের কথাবার্তা ও ভাষার ধরন সম্পর্কে অপরিচিত কেউ তাঁদের অনুকরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই সন্দেহ থেকেই বাক্যটি আন্দোলনকারীদের কাছে ব্যঙ্গের উপাদান হয়ে ওঠে।

বিক্ষোভকারীরা স্লোগানটি ব্যবহার করে আন্দোলনে নজরদারি ও অনুপ্রবেশের চেষ্টাকে উপহাস করতে শুরু করেন।

তাঁদের কাছে এটি শুধু একটি হাস্যকর বাক্য নয়, বরং কর্তৃপক্ষ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দূরত্বের প্রতীক।

ফ্রান্সে কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত মানুষের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, সামাজিক বৈষম্য ও জাতিগত পূর্বধারণার কারণে তাঁদের অন্যায়ভাবে সন্দেহ করা হয়। তাঁদের মতে, আলোচিত বার্তাটিও সেই ধারণার প্রতিফলন।

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের এজেন্টরা ওই বাক্য ব্যবহার করেছেন কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা কখনও কখনও অনলাইনে ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করেন। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ শনাক্ত করা এবং আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ সংগ্রহ করা এর উদ্দেশ্য হতে পারে।

কেন তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হলো স্লোগানটি?

শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদের মতে, এই বাক্যটি তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের ধারণার সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের ব্যবধানকে তুলে ধরে। শিক্ষার্থী ইউনিয়নের মুখপাত্র সাবরিন খারবাচের বক্তব্য, কোনও তরুণ স্বাভাবিকভাবে এভাবে কথা বলেন না। তাই স্লোগানটিকে নিজেদের করে নিয়ে আন্দোলনকারীরা বোঝাতে চেয়েছেন, তাঁদের ওপর নজরদারি বা আন্দোলনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা তাঁদের চোখ এড়ায় না।

বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদির মতে, বার্তাগুলো কর্তৃপক্ষের পূর্বধারণার ইঙ্গিত দেয়। কারা ব্যারিকেড তৈরি করছে বা ভাঙচুরের পরিকল্পনা করছে, তা যেন আগেই ধরে নেওয়া হয়েছে।

প্যারিসের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফেদ্রে কেমেনও বাক্যটিকে তরুণদের কথাবার্তার একটি হাস্যকর ও অস্বাভাবিক অনুকরণ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি বর্ণবাদী ধারণারও প্রতিফলন হতে পারে, কারণ এতে ভাঙচুরের সঙ্গে আরব বংশোদ্ভূত মানুষদের এক করে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।

ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে স্লোগান

ফ্রান্সের বাইরে বেলজিয়াম ও জার্মানির অনুরূপ বিক্ষোভেও স্লোগানটি ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বাক্যটি উচ্চারণ করেন। ভিডিওতে তিনি ‘জেন-জি’ প্রজন্মের তরুণদের জনপ্রিয় কিছু অঙ্গভঙ্গিও তুলে ধরেন।