রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় মানবাধিকারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করল ভারত। দেশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের প্রতিনিধি তথা বিদেশ মন্ত্রকের ডেপুটি সেক্রেটারি বরখা তাম্রাকর। একই সঙ্গে ভারতে তরুণদের আন্দোলন দমন এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করার অভিযোগও খারিজ করেছে নয়াদিল্লি।

বুধবার রাষ্ট্রপুঞ্জের ৮১তম সাধারণ সভার থার্ড কমিটির অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বরখা বলেন, মানবাধিকারের বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা কিংবা বেছে বেছে নির্দিষ্ট কোনও দেশকে নিশানা করা উচিত নয়। তাঁর কথায়, অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার যে কোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে ভারত।

রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও জমায়েতের অধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত জিনা রোমেরোর গত সপ্তাহে পেশ করা একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করেই এই বিতর্ক। ওই প্রতিবেদনে দিল্লি-সহ ভারতের বিভিন্ন শহরে তরুণদের সাম্প্রতিক আন্দোলন এবং সেখানে সরকারি দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভারতে তরুণেরা লিঙ্গসমতা ও ন্যায়বিচারের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা কিংবা প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্তরে দমন-পীড়ন, প্রতিহিংসা এবং কলঙ্কলেপনের মুখে পড়েন।

প্রতিবেদনে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নাম উল্লেখ করে দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে হওয়া শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করার অভিযোগও তোলা হয়েছিল। তবে ভারত এই অভিযোগের বিরোধিতা করেছে।

এর আগে রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের ফার্স্ট সেক্রেটারি অনুজ স্বরূপ প্রতিবেদনটি খারিজ করে দাবি করেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বেনামি এবং যাচাই না করা কয়েকটি চিঠির উপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের প্রতিবেদন রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ভারতের অবস্থান তুলে ধরে অনুজ আরও বলেন, ভারতীয় সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকদের বাক্‌স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার স্বীকৃত। তাঁর দাবি, দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণেরা বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনভাবে আন্দোলন করতে পারেন। সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা এবং মতবিনিময়ের মাধ্যমেও নীতিগত পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।

বরখা তাম্রাকর তাঁর বক্তব্যে ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো, বিচারব্যবস্থা, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এই প্রতিষ্ঠানগুলি নাগরিকদের অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রক্রিয়ায় ভারতের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে বরখা বলেন, পারস্পরিক বিশ্বাস, স্বচ্ছতা এবং প্রতিটি দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের প্রতি সম্মান বজায় রেখেই এই সহযোগিতা হওয়া উচিত। কোনও ধরনের দ্বিচারিতা বা পক্ষপাতদুষ্টতার ভিত্তিতে মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত একদিকে যেমন মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে, অন্যদিকে দেশের তরুণদের আন্দোলন দমনের অভিযোগের বিরুদ্ধেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।