আবদুল ওদুদ: কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপের কাছে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বুধবার, ২১ অক্টোবর জারি করা সরকারি নির্দেশে কলকাতা হাইকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে এই তদন্তকারী দল গঠনের কথা জানানো হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীকে এই দলের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে কোনও গাফিলতি ছিল কি না, প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ত্রুটি এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই দলকে। নির্দেশ জারির দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট ও সুপারিশ রাজ্য সরকারের কাছে জমা দিতে হবে।
আরও পড়ুন:
মুখ্যসচিবের দফতর থেকে জারি করা ৩৩৭-সিএস/২০২৬ নম্বর নির্দেশে বলা হয়েছে, গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬ কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপের কাছে মর্মান্তিক পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় জননিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সেই কারণেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও বিস্তারিত তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।আরও পড়ুন:
তদন্তকারী দল ঘটনার আগে ও পরে ঠিক কী ঘটেছিল, কখন এবং কোথায় ভিড়ের চাপ বাড়তে শুরু করেছিল, কী পরিস্থিতিতে পদপিষ্টের ঘটনা ঘটেছিল, তার বিস্তারিত অনুসন্ধান করবে। অতিরিক্ত ভিড়, প্রতিকূল আবহাওয়া, ভিড় নিয়ন্ত্রণে ত্রুটি, প্রবেশ ও বেরোনোর পথে অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা, কাঠামোগত দুর্বলতা, বৈদ্যুতিক গোলযোগ এবং গুজবের মতো কোনও বিষয় ঘটনার জন্য দায়ী ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রথম কখন, কোথায় এবং কীভাবে ভিড়ের ঢল তৈরি হয়েছিল, কীভাবে তা পদপিষ্টের পরিস্থিতিতে পরিণত হয় এবং মণ্ডপ চত্বরে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা নির্ধারিত নিরাপদ ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গিয়েছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় থাকবে।
আরও পড়ুন:
ঘটনার সময়কার আবহাওয়ার পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া দফতরের রিপোর্ট, বৃষ্টিপাত, বজ্রঝড়ের সতর্কতা, দৃশ্যমানতা এবং মাটির অবস্থার সঙ্গে ভিড়ের চলাচল ও আতঙ্কের কোনও সম্পর্ক ছিল কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। জনসমক্ষে কোনও ঘোষণা, বাঁশি বাজানো, গুজব, হঠাৎ মানুষের চলাচল কিংবা অন্য কোনও ঘটনা ভিড়ের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হবে।
আরও পড়ুন:
পাশাপাশি পুজো মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, চলাচলের করিডর, ব্যারিকেড, সিঁড়ি, গেট, জরুরি নির্গমন পথ এবং অন্যান্য কাঠামোগত ও প্রবেশ-নির্গমন ব্যবস্থার অবস্থা ও পর্যাপ্ততা পরীক্ষা করা হবে। পুজো উদ্যোক্তা, বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী, স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ, অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা, হাসপাতাল, দমকল এবং সংশ্লিষ্ট নাগরিক প্রশাসনের প্রস্তুতি, ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানাতে কতটা সময় লেগেছিল এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কী ভূমিকা ছিল, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে।
আরও পড়ুন:
তদন্তের প্রয়োজনে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলে তোলা ভিডিও, ফরেনসিক রিপোর্ট, ফোনের কল রেকর্ড, থানার নথি, কন্ট্রোল রুমের লগ, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রমাণ পরীক্ষা করা হবে। পুজোর অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, পর্যাপ্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা, বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকল্পনা, জরুরি সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা এবং পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হয়েছিল কি না, তা-ও তদন্তের বিষয় হবে। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, বিচারবিভাগীয় নির্দেশিকা এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে চলা হয়েছিল কি না, তাও দেখা হবে।
আরও পড়ুন:
পুজো উদ্যোক্তা, পুলিশ, কলকাতা পুরনিগম, পূর্ত দফতর, দমকল ও জরুরি পরিষেবা, কলকাতা স্টেট ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কর্পোরেশন (সিইএসসি) অথবা অন্য কোনও সংস্থা বা ব্যক্তির গাফিলতি, কর্তব্যে অবহেলা কিংবা সমন্বয়ের অভাব ছিল কি না, তা নির্ধারণ করবে সিট। তদন্তে কোনও দায় বা ত্রুটি চিহ্নিত হলে আইন অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।
আরও পড়ুন:
বিশেষ করে উত্তর কলকাতার সংকীর্ণ গলিতে বড় দুর্গাপুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য ভবিষ্যতে কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সে সম্পর্কেও সুপারিশ করবে তদন্তকারী দল। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিরাপদ দর্শনার্থীর সংখ্যা নির্ধারণ, পর্যাপ্ত প্রবেশ ও নির্গমন পথ, সিসিটিভি নজরদারি, জনঘোষণা ব্যবস্থা, জরুরি অবস্থায় মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলির উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:
পদপিষ্টের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারকে কী ধরনের সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে, কিংবা আরও কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা-ও তদন্তের আওতায় থাকবে। ঘোষিত আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট কি না এবং ঘটনার কারণ নির্ধারণ, দায় স্থির করা ও ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকানোর জন্য অন্য কোনও পদক্ষেপ প্রয়োজন কি না, সে বিষয়েও সিট সুপারিশ করবে।
আরও পড়ুন:
সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীকে চেয়ারম্যান করে গঠিত এই দলে সদস্য হিসেবে থাকছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিপর্যয় মোকাবিলা ও অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের প্রধান সচিব, রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) ডিরেক্টর জেনারেল ও ইন্সপেক্টর জেনারেল, রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল ও ইন্সপেক্টর জেনারেলের মনোনীত একজন প্রতিনিধি, যাঁর পদমর্যাদা অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেলের নিচে হবে না, রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার নিচে নন এমন একজন প্রতিনিধি এবং কলকাতায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (এনডিআরএফ) একজন প্রতিনিধি।
আরও পড়ুন:
তদন্তের কাজ সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হলে রাজ্য সরকারকে অন্য কোনও আধিকারিককে দলে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানাতে পারবে সিট। সংশ্লিষ্ট সব দফতর, কর্তৃপক্ষ, সংস্থা ও ব্যক্তিকে তদন্তকারী দলকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নথি, তথ্য ও সহায়তা দিতে হবে।