উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়: সুন্দরবনের কুলতলি ও সংলগ্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণে মৎস্যজীবীদের আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই বহু মানুষ নদী-খাঁড়ি পেরিয়ে গভীর জঙ্গলে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যান। কেউ যান মধু সংগ্রহে। আর সেই সময়ই কখনও কখনও তাঁদের সামনে হাজির হয় সুন্দরবনের বাঘ। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ।একটি তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত ২৫ বছরে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে ৪২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৯৫ জন। চলতি বছরের জুন মাসেও মৈপীঠের পয়লাঘেরি এলাকার বাসিন্দা বন্দনা দাস (৩৭) ফুলবাড়ি জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান।মৈপীঠ এলাকার আরও এক মৎস্যজীবীর মৃত্যুর ঘটনা ও সামনে এসেছে।
বাঘের আক্রমণের আশঙ্কা জেনেও কেন মানুষ বারবার জঙ্গলে যাচ্ছেন? স্থানীয়দের বক্তব্য, এর অন্যতম কারণ জীবিকার সংকট। সুন্দরবনের বহু পরিবার মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় সংসার চালাতে বাধ্য হয়েই তাঁদের জঙ্গলমুখী হতে হয়।কলস ক্যাম্পসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় মানুষ প্রায়শই নদী, খাঁড়ি এবং গভীর জঙ্গলে বাঘের হামলার শিকার হন। কারও মৃত্যু হয়, কেউ গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন কর্মক্ষমতা হারান। ফলে একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না, বিপন্ন করে গোটা পরিবারকে।এরপর শুরু হয় আরেক লড়াই—সরকারি ক্ষতি পূরণ পাওয়ার লড়াই।বাঘের আক্রমণে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতি পূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা ও জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় নথি, প্রমাণ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়।এই পরিস্থিতিতে বাঘের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলির পাশে দাঁড়িয়ে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সরকারি ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করে চলেছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। সংগঠনটির এই ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে,সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা এবং বাঘের প্রাকৃতিক খাদ্যভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি। জঙ্গলে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান থাকলে বাঘের লোকালয়ে বা মানুষের এলাকায় খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে আসার প্রবণতা কমতে পারে। তাই শুধু বাঘ সংরক্ষণ নয়, বাঘের খাদ্যশৃঙ্খল এবং গোটা সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।একই সঙ্গে মৎস্যজীবীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। স্থানীয় মানুষের হাতে যদি মাছ-কাঁকড়া ধরার পাশাপাশি স্থায়ী ও নিরাপদ আয়ের সুযোগ থাকে, তাহলে তাঁদের ঝুঁকি নিয়ে গভীর জঙ্গলে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। এতে একদিকে মানুষের জীবন সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে বাঘও মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ কম পাবে।সুন্দরবনের মানুষ এবং বাঘ—দু’পক্ষের অস্তিত্বই এই বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে। তাই বাঘকে রক্ষা করতে গিয়ে মানুষকে উপেক্ষা করা যেমন চলবে না, তেমনই মানুষের নিরাপত্তার কথা বলতে গিয়ে বাঘের প্রাকৃতিক পরিবেশও নষ্ট করা যাবে না। প্রয়োজন মানুষের জীবন-জীবিকা এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়,বাঘের আক্রমণে কেউ নিহত বা আহত হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে দ্রুত সরকারি ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দিতে হবে। দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতায় যেন অসহায় পরিবারগুলি আরও বিপন্ন না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণের সংখ্যা কমাতে হলে একসঙ্গে একাধিক ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে—জঙ্গলের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা, মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান, জঙ্গলে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং আক্রান্ত পরিবারগুলিকে দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রদান।নইলে জীবিকার তাগিদে মানুষ যেমন জঙ্গলে যেতে বাধ্য হবে, তেমনই মানুষের সঙ্গে বাঘের সংঘাতও চলতেই থাকবে। আর প্রতি বছরই বাড়তে থাকবে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে আহত ও নিহতের হিসেব। এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সরকারেরই।