বাহাত্তর বছর বয়সে জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিলেন বাংলার বিশিষ্ট দলিত নেতা, সমাজকর্মী ও বহু গ্রন্থের লেখক সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস। সোমবার প্রদেশ কংগ্রেস দফতরে তাঁর হাতে দলের পতাকা তুলে দেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। তাঁর সঙ্গে এদিন ডোম, আদিবাসী ও মতুয়া সমাজের একাধিক নেতাও কংগ্রেসে যোগ দেন।
আরও পড়ুন:
সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত, শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করে আসছেন। ব্যাংকে চাকরি করার সময় সংরক্ষণ বাস্তবায়নের দাবিতে সাত দিন অনশন করেছিলেন। পাশাপাশি ব্যাংক কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এনআরসি-র সময় অসমের বাঙালিদের পাশে দাঁড়াতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি ফর বেঙ্গলি রিফিউজি’। বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তু হিন্দু বাঙালিদের, বিশেষত মতুয়াদের নিঃশর্ত নাগরিকত্বের দাবিতে রাজ্যজুড়ে পদযাত্রা করেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে মতুয়া সমস্যার কথাও তুলে ধরেছেন। মতুয়াদের নাগরিকত্ব, সার্বিক উন্নয়নের জন্য ঠাকুরবাড়ি ও ধর্মতলায় একাধিকবার ধর্নায় বসেছেন।
সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস দিল্লির যন্তর মন্তরেও মতুয়াদের হয়ে অন্দোলন করেছেন।আরও পড়ুন:
আম্বেদকরবাদ, মতুয়া সমাজ, দলিত ও উদ্বাস্তু বাঙালিদের নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস। অসমের নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের দাবিতে তিনি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই করেছেন। দলিতদের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে বারবার পথে নেমেছেন। বাবাসাহেব আম্বেদকরের পরিবারের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ রয়েছে।
শুধু দলিত সমাজ নয়, মুসলিম সমাজের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মুসলিম নেতা ও সংগঠনের সঙ্গে একাধিক ইস্যুতে বৈঠক ও আলোচনা করেছেন তিনি। মুসলিম সমাজের বিভিন্ন সভা ও জলসায় বক্তব্যও রেখেছেন। ‘পুবের কলম’-এও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নিয়মিত লেখেন।
আরও পড়ুন:
কিন্তু ৭২ বছর বয়সে কেন কংগ্রেসে যোগ দিলেন, এই প্রশ্নের উত্তরে ‘পুবের কলম’-কে সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, “সাংসদ, বিধায়ক বা মন্ত্রী হতে এই বয়সে কংগ্রেসে যোগ দিইনি।
এই মুহূর্তে দেশের যে দুর্দিন চলছে, সেখানে এই মুহূর্তে একমাত্র বিকল্প কংগ্রেস।”তিনি আরও বলেন, কংগ্রেস অনেক কিছু সংশোধন করেছে এবং এখন সামাজিক ন্যায়ের কথা বলছে। দলিত ও সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের বিষয়েও দলটি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তাঁর মত। তাঁর কথায়, এই শেষ বয়সে সকলকে একটি বার্তা দেওয়া দরকার- কংগ্রেসই বিজেপিকে ঠেকাতে পারে। তাঁকে দেখে অন্যরাও যাতে এই পথে আসেন, সেই লক্ষ্যেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত।
আরও পড়ুন:
সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস জানান, রাজ্যজুড়ে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে তিনি কথা বলবেন এবং কংগ্রেসকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করবেন। তাঁর বক্তব্য, “সকলকে নিয়ে চলার মধ্যেই ভারতের কল্যাণ নিহিত আছে। কাউকে বঞ্চিত করে নয়, সকলের উন্নয়ন হলেই ভারত এগিয়ে যাবে।”
আরও পড়ুন:
২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন নিয়েও আত্মবিশ্বাসী সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস। ‘পুবের কলম’-কে তিনি বলেন, “২০২৯ সালে কেন্দ্রে বিজেপি থাকবে না।
আমি দুই বছর আগেই বলেছি, এটাই বিজেপির শেষ সরকার। এরপর আর তারা ফিরবে না।”আরও পড়ুন:
নাগরিকত্ব সমস্যার সমাধান নিয়ে তিনি বলেন,'আমি মনে করি, একটি আইন এনে ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী সকলকে নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট দেওয়া উচিত। দীর্ঘদিন এই সমস্যা চলতে পারে না।'
আরও পড়ুন:
ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ। অথচ এই অংশের মানুষ বারবার বঞ্চিত হয়েছেন-এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাসের মতো মানুষ সেই বঞ্চনার অবসানের দাবিতে সারাজীবন সরব থেকেছেন। লিখেছেন, আন্দোলন করেছেন, পথে নেমেছেন। এর জন্য তাঁকে নানা সময়ে লাঞ্ছনা ও গঞ্জনাও সহ্য করতে হয়েছে।
তারপরও তিনি বহন করে চলেছেন বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বার্তা এবং ভারতীয় বহুত্ববাদের ধারণা। এবার কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর সামাজিক ন্যায়, দলিত-আদিবাসী অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের প্রশ্নে তিনি কতটা জোরালো ভূমিকা নিতে পারেন, সেদিকেই নজর থাকবে বাংলার রাজনৈতিক মহলের।