প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক এবং কবি ডা. কামাল হোসেন ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।শনিবার স্বাধীনতা দিবসের দিনে সকাল ৭টায় তিনি মারা যান। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন স্ট্রোক হওয়ার পর। তাঁর এই ইন্তেকালে বাংলার সাহিত্য ও চিকিৎসকমহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ডা. কামাল হোসেন মুর্শিদাবাদের বহরমপুর থেকে উঠে আসা এক বিদ্বগ্ধ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর সহোদর কবি নাসের হোসেনও বিদ্বৎসমাজে সুপরিচিত ছিলেন। এছাড়া তাঁর বোন সোনালীও একজন লেখিকা। পুত্র কুণাল হোসেন অধ্যাপক৷
আরও পড়ুন:
স্বাধীনতা পরবর্তী এপার বাংলায় মুসলিম লেখক ও কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর লেখনী হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকলের কাছেই বিশেষ জনপ্রিয় ছিল।
পেশাগত জীবনে তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে সমাজসেবার কাজেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। মাদার টেরেসার একটি প্রতিষ্ঠানে তিনি রোগী দেখতেন। উত্তর ২৪ পরগনার একটি ক্লিনিকেও গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য তিনি প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত বসতেন। এত বড় মানের লেখক ও চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। তিনি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতেন।এপার বাংলায় স্বাধীনতা পরবর্তীতে মুসলিম লেখকের সংখ্যা যখন কমে গিয়েছিল, তখন সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আবু আতাহার ও আবদুল আযীয আল-আমান প্রমুখের অনুজ হিসেবে নিজেকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ডা. কামাল হোসেন। তাঁর ছোটগল্প ও পুস্তকে স্বাধীনোত্তর মুসলিম সমাজ ও পরিবারের সংকট দারুণভাবে ফুটে উঠলেও তাঁর লেখার পরিধি ছিল বৃহত্তর বাঙালি সমাজকেন্দ্রিক। বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও পাক্ষিক পত্রিকায় তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ, ছোটগল্প ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে পরিবর্তন, শিলাদিত্য, সাপ্তাহিক বর্তমান এবং কলম পত্রিকা উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৯ সালে বুদ্ধদেব বসু ও প্রতিভা বসুর ‘কবিতা ভবন’ থেকে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্য প্রকাশ’ প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ ও বইগুলির মধ্যে রয়েছে ‘উপকথার জন্মবৃত্তান্ত’, ‘মর্ত্যে তিন পরি’, ‘শীতঘুম’, ‘আকলির নীল স্বর্গ’, ‘ফেরিওয়ালার দিন’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘পর্যটন’, ‘সুকুর আলির ২৪ ঘণ্টা’, ‘প্রেমের গল্প’ এবং ‘শরীরের মানচিত্র’।
উপন্যাস সাহিত্যেও তিনি রেখেছেন অনন্য অবদান। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘পরম বিশ্বাসের গন্ধ’ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার লাভ করে। তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত অন্য একটি উপন্যাস ‘বাণপ্রস্থ’ বাংলা উপন্যাসের ধারায় একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এছাড়া ‘দ্বীপভূমি’ উপন্যাসটি প্রমা পুরস্কার লাভ করে। ‘শিকড়ের প্রবাহ’ এবং আরও একটি উপন্যাস অন্য ধারার রচনা। তাঁর তীব্র স্যাটায়ারধর্মী ‘স্বভূমি’ উপন্যাসটি মানুষ ও সমাজের নানা ভণ্ডামির বিচিত্র মুখোশ উন্মোচন করে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
কবিতাতেও তাঁর মুন্সিয়ানা ছিল লক্ষণীয়। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতার বই ‘সীমান্তের মানুষ’। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘তুমি একা নও’, ‘পাতাল নির্মাণ’, ‘পহেলগাঁও কবিতাগুচ্ছ’, ‘লাফিংবুদ্ধ’, ‘চ্যাপলিনের নতুন ঠিকানা’, ‘শুভ বিবাহ’, ‘দাহ’, ‘তোমার মগ্ন হেঁটে যাওয়া’ এবং ‘নির্বাচিত প্রেমের কবিতা’।
আরও পড়ুন:
তিনি ২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর প্রথম স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। গত চার বছর ধরে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু গত ১ আগস্ট তিনি আচমকা পুনরায় তীব্র স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। অবশেষে শনিবার স্বাধীনতার দিন তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
আরও পড়ুন:
তিনি ‘পুবের কলম’ পত্রিকার একজন বিশিষ্ট লেখক ছিলেন। নিজ নামে ও ছদ্মনামে তাঁর বহু লেখা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রাক্তন সাংসদ ও পুবের কলম পত্রিকার সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সবর বা ধৈর্য ধারণের জন্য দোয়া করেছেন। শুভানুধ্যায়ী ও গুণগ্রাহীরাও তাঁর ইন্তেকালে গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন।
আরও পড়ুন:
এদিকে প্রখ্যাত আইনজীবী একরামুল হক বারী ও পুত্র কুণাল হোসেন জানিয়েছেন, মরহুমের জানাজা ও দাফন দুপুর পর বাগমারি কবরস্থানে হবে।