পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: ডা. কামাল হোসেন প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং কথাসাহিত্যিক, কবি হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি এখন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এক হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি রয়েছেন। 
ডা. কামাল হোসেন স্বাধীনতা পরবর্তী এপার বাংলায় মুসলিম লেখক ও কথাসাহিত্যিক হিসেবে একটি অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। ‘মুসলিম’ শধটি বাদ দিলেও তাঁর লেখা বইগুলি হিন্দু মুসলিম, খ্রিস্টান সবার কাছেই বিশেষ জনপ্রিয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি সমাজসেবার কাজেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। মাদার টেরেসার একটি প্রতিষ্ঠানে তিনি রোগী দেখতেন। এছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনার একটি ক্লিনিকেও গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য তিনি প্রতি সপ্তাহে বসতেন। 
এত বড় লেখক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে কোনও গর্ব বা অহংবোধ ছিল না। মানুষের সঙ্গে মিশতেন স্বচ্ছন্দে ।


স্বাধীনতা পর পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম লেখকের সংখ্যা কমে গিয়েছিল। এপারে ছিলেন সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আবু আতাহার, আবদুল আজিজ আল-আমান প্রমুখ হাতেগোনা কয়েকজন লেখক। এদের অনুজ হিসেবে নিজেকে  প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন ডা. কামাল হোসেন। তাঁর কয়েকটি ছোট গল্প ও পুস্তকে স্বাধীনতাত্তোর মুসলিম সমাজ ও পরিবারের সংকটও উঠে এসেছে। কিন্তু তাঁর লেখার অনেকটাই হচ্ছে বৃহত্তর বাঙালি সমাজকে কেন্দ্র করে।
ডা. কামাল হোসেনের লেখা বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, পাক্ষিক পত্রিকায় তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। পরিবর্তন, শিলাদিত্য, সাপ্তাহিক বর্তমান পত্রিকা এবং কলম পত্রিকায়ও নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হত। কামাল হোসেনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্য প্রকাশ’ প্রকাশিত হয় বুদ্ধদেব বসু-প্রতিভা বসুর ‘কবিতা ভবন’ থেকে ১৯৭৯ সালে। এছাড়া বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয় ‘উপকথার জন্মবৃত্তান্ত’, ‘মর্ত্যে তিন পরি’, ‘শীতঘুম’, ‘আক্লির নীল স্বর্গ’, ‘ফেরিওয়ালার দিন’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘পর্যটন’, ‘সুকুর আলির ২৪ ঘণ্টা’, ‘প্রেমের গল্প’, ‘শরীরের মানচিত্র’।

কামাল হোসেনের উপন্যাস ‘পরম বিশ্বাসের গন্ধ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতায় তাঁর এই উপন্যাস প্রথম পুরস্কার লাভ করে। তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘বাণপ্রস্থ’ বাংলা উপন্যাসের ধারায় একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তাঁর ‘দ্বীপভূমি’ উপন্যাসটি প্রমা পুরস্কারপ্রাপ্ত। ‘শিকড়ের প্রবাহ’ ও আরও একটি উপন্যাস অন্য ধারার। ‘স্বভূমি’ উপন্যাসটিতে মানুষের ও সমাজের নানা ভন্ডামির বিচিত্র মুখোশ উন্মোচন করেছেন লে'ক। তীব্র স্যাটায়ারধর্মী এই উপন্যাসটি বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
কামাল হোসেনের প্রথম কবিতার বই ‘সীমান্তের মানুষ’, এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘তুমি একা নও’, ‘পাতাল নির্মাণ’, ‘পহেলগাঁও কবিতাগুচ্ছ’, ‘লাফিংবুদ্ধ’, ‘চ্যাপলিনের নতুন ঠিকানা’, ‘শুভ বিবাহ’, ‘দাহ’, ‘তোমার মগ্ন হেঁটে যাওয়া’, ‘নির্বাচিত প্রেমের কবিতা’।
২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর ডা. কামাল হোসেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।
চার বছর ধরে ধীরে ধীরে তিনি সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ১ আগস্ট আচমকা পুনরায় তীব্র স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। বর্তমানে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে তাঁকে। তাঁর এক ভাই নাসের হোসেনও ছিলেন খ্যাতনামা কবি। তিনিও অবশ্য ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর এক বোনও সোনালীও লেখিকা। 
ডা. কামাল হোসেনের নিকটজনেরা তাঁর জন্য দোয়ার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর অসুস্থতায় পুবের কলম পত্রিকার সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর সুস্থতা এবং কষ্ট লাঘবের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। তিনি ছিলেন পুবের কলম পত্রিকার একজন বিশিষ্ট লেখক। নিজ নামে ও ছদ্মনামে তাঁর বহু লেখা পুবের কলম পত্রিকায় ছড়িয়ে রয়েছে।