উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : খড়ের চাল আর মাটির কুঁড়েঘরে যেন আচমকাই নেমে এল আলোর রোশনাই। দেশের রাজধানী দিল্লির লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েও আর্থিক অনটনের কারণে শেষ পর্যন্ত সেখানে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয়ে ছিল সুন্দরবনের এক দরিদ্র পরিবার। শেষমেশ সেই সংশয় কাটল।এবার বিধায়কের সহযোগিতায় বিমানে চেপে দিল্লি গেলেন সুন্দরবনের মেধাবী ছাত্রী সেলিমা মোল্লা।বাসন্তীর ফুল মালঞ্চ গ্রামের ঋতুভগত হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী সেলিমা। ‘বিকশিত ভারত’ নিয়ে ৫০০ শব্দের একটি প্রবন্ধ লিখে যথাস্থানে পাঠিয়েছিল সে। সেই প্রবন্ধ প্রশংসিত হওয়ার পর ১৫ আগস্ট দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লায় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য সেলিমার কাছে আমন্ত্রণআসে। স্বাভাবিকভাবেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে পরিবার।

কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেই দেখা দেয় বড় বাধা—অর্থ।সেলিমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার হলেও মেয়ের পড়াশোনায় কোনও খামতি রাখেননি বাবা-মা। কিন্তু বিমানে দিল্লি যাওয়া, সেখানে থাকা—সব মিলিয়ে যে খরচ হবে, তা বহন করার সামর্থ্য পরিবারের ছিল না। ফলে আমন্ত্রণ পেয়েও সেলিমার দিল্লি যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।শেষ পর্যন্ত সেলিমার পাশে দাঁড়ান ক্যানিং পশ্চিমের বিধায়ক পরেশ রাম দাস। সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে তিনি উদ্যোগী হন। তাঁর সহযোগিতাতেই সেলিমার দিল্লি যাতায়াতের বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়।
রাজধানীতে থাকার জন্য দেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা। পাশাপাশি প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্রের ব্যবস্থাও করা হয়।শুক্রবার সকালে নিজের গাড়িতে করে সেলিমাকে দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন বিধায়ক পরেশ রাম দাস। সেখান থেকে বিমানে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেয় নবম শ্রেণির ওই ছাত্রী। বিমানে ওঠার পর সেলিমার চোখেমুখে ছিল আনন্দ ও উচ্ছ্বাস। জীবনে প্রথমবার এমন একটি ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে আপ্লুত সে।বিধায়ক পরেশ রাম দাস বলেন, “সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পারলাম, আমাদের সুন্দরবনের এক ছাত্রী দিল্লীর লালকেল্লার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েও আর্থিক কারণে যেতে পারছে না। বিষয়টি জানার পর সমস্ত ব্যবস্থা করি।
প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে দিল্লিতে পৌঁছনোর পর যে অনুমতি পত্রের প্রয়োজন হয়, তারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমার বিধায়কের বেতন থেকে এই পরিবারটিকে সাহায্য করেছি।”দিল্লি পৌঁছনোর পর পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথাও বলে সেলিমা। তার কথায়, “৫০০ শব্দের প্রবন্ধ লিখে দিল্লির লালকেল্লায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ভারতের স্বাধীনতা দিবসের পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ আমার কাছে খুবই আনন্দের। বিধায়ক পাশে এসে দাঁড়ানোয় আমরা দিল্লি পৌঁছতে পেরেছি।”একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর থেকে দেশের রাজধানীর ঐতিহাসিক লালকেল্লা—সেলিমার এই যাত্রা শুধু তার পরিবারের কাছে আনন্দের নয়, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার মেধা ও প্রতিভারও এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি। আর্থিক প্রতিবন্ধকতা যে প্রতিভার পথ চিরদিন আটকে রাখতে পারে না, সেলিমার দিল্লি যাত্রা যেন তারই এক অনুপ্রেরণামূলকউদাহরণ।