উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়: সুন্দরবনের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদের এক অনন্য ভাণ্ডার হলো খাড়ী-ছত্রভোগ সংগ্রহশালা। অথচ সরকারি উদ্যোগ ও পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তার অভাবে আজও ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়ে রয়েছে এই সংগ্রহশালা। প্রয়াত প্রত্নতত্ত্ব গবেষক দীনবন্ধু নস্করের আজীবনের সাধনার ফসলকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আগলে রেখেছেন তাঁর পুত্র পঙ্কজ নস্কর। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর দু নং ব্লকের দক্ষিণ কাশীনগরের বাসিন্দা দীনবন্ধু নস্কর ছিলেন সুন্দরবনের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার এক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ।

প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি না থাকলেও তাঁর গবেষণা, সংগ্রহ এবং তথ্যভাণ্ডার বহু গবেষক, শিক্ষক ও ইতিহাসবিদের কাছে ছিল নির্ভরযোগ্য উৎস। নিজের জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি উৎসর্গ করেছিলেন সুন্দরবনের অতীত ইতিহাস, প্রত্নসম্পদ এবং লোকঐতিহ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজে।

১৯৯০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন খাড়ী ছত্রভোগ সংগ্রহশালা। দীর্ঘ কয়েক দশকের অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি জেলার কুলতলি, ক্যানিং, জয়নগর, বারুইপুর, গোসাবা, সোনারপুর, বাসন্তীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করেন অসংখ্য মূল্যবান প্রত্ননিদর্শন। তাঁর সংগৃহীত সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন পাথরের মূর্তি, মৃৎপাত্র, টেরাকোটা, ধাতব নিদর্শন, অস্থি, প্রাচীন দলিল দস্তাবেজ, শিলালিপি, তাম্রফলক, মুদ্রা, পুঁথি, হাতির দাঁতের শিল্পকর্ম, হাড়ের অলংকার, কৃষি যন্ত্র, প্রাচীন পোশাক, গ্রাম্য ইট, পোড়ামাটির প্রতিমা, শঙ্খ, চিত্রকর্ম, অস্ত্রশস্ত্র এবং আরও বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন।

গবেষকদের মতে, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের বহু প্রাচীন সভ্যতার চিহ্ন আজ মাটির নিচে চাপা পড়ে রয়েছে। সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের অসংখ্য নিদর্শন উদ্ধার করে সংরক্ষণ করেছিলেন দীনবন্ধু নস্কর। জীবনের শেষদিকে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন তিনি।

পরে তাঁর মৃত্যু হলেও থেমে যায়নি সেই সংগ্রামের পথ। বর্তমানে তাঁর পুত্র পঙ্কজ নস্কর অত্যন্ত সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যেও এই সংগ্রহশালা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

পঙ্কজ নস্করের কথায়, বাবার আজীবনের সাধনার সম্পদ রক্ষা করাই এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু সরকারি সহযোগিতা ও আর্থিক সাহায্য ছাড়া এই বিশাল সংগ্রহ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। সম্প্রতি এই সংগ্রহশালা পরিদর্শনে এসে গোসাবার বিধায়ক বিকর্ণ নস্কর বলেন, এত দারিদ্র্যের মধ্যেও পঙ্কজ নস্কর কোটি কোটি টাকার মূল্যবান প্রত্নসম্পদ নিজের ভাঙা বাড়িতে যত্ন করে সংরক্ষণ করছেন। সরকার ও সমাজের সহযোগিতা পেলে এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ মিউজিয়াম গড়ে তোলা সম্ভব।

পাল যুগ, সেন যুগ, মধ্যযুগসহ বাংলার ইতিহাসের অসংখ্য মূল্যবান নিদর্শন এখানে রয়েছে। এই সংগ্রহশালা শিক্ষার্থীদের জন্য এক জীবন্ত পাঠশালা হয়ে উঠতে পারে।

জানা যায়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ইতিহাস গবেষক কালিদত্তের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন দীনবন্ধু নস্কর। প্রত্নতত্ত্ব, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, নদীমাতৃক জনপদ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে এবিটিএ টেস্ট পেপারেও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়, যা কাশীনগর হাই স্কুল-সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পাঠ্য সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সরকার বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু খাড়ী-ছত্রভোগ সংগ্রহশালার ভাগ্য বদলায়নি। ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ আজও অনাদরে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই সংগ্রহশালাকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। কারণ, এটি শুধু একটি সংগ্রহশালা নয়—সুন্দরবন ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক অমূল্য ভাণ্ডার।