পুবের কলম প্রতিবেদক: ওয়াকফ সম্পত্তি বেআইনিভাবে ‘দখল’ করে তৃণমূলের পার্টি অফিস তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তির উপর বেআইনি নির্মাণ করে বসতি শুরু হয় বিগত সরকারের আমলে। সেই বেআইনি নির্মাণ ভাঙার উদ্যোগ নেয় রাজ্য প্রশাসন। রবিবার সাড়ে এগারোটা নাগাদ টালিগঞ্জ থানার পুলিশ আধিকারিকরা কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং কলকাতা পুরসভার কর্মীদের নিয়ে হাজির হয় কালীঘাট ট্রামডিপোর পিছনে থাকা সাহেববাগান বস্তির এন্ট্রান্স গেটের সামনে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডের আধিকারিকরাও। ওই গেটের ভিতরের অংশ থেকেই শুরু হয়েছে মাইসর ফ্যামিলি ফাতেহা ফান্ড ওয়াকফ স্টেট। এই ওয়াকফ স্টেটের মধ্যে রয়েছে তৎকালীন যুগের ভগ্ন প্রায় ঐতিহ্যবাহী হেরিটেজ মসজিদ সহ অনেকগুলি স্মৃতি সৌধ। সেই মসজিদের গম্বুজ  ও দেওয়াল জুড়ে বাহির থেকে ভিতরে যাতায়াতের রাস্তা তৈরি করে বসবাস শুরু হয়েছে। এই ওয়াকফ স্টেটে কবরস্থান রয়েছে ১২ বিঘা। আর ৪ বিঘা রয়েছে বাউন্ডারি ঘেরা মাঠ। সেই মাঠও দ'লের চেষ্টা চলছে। এই ১২ বিঘা কবরস্থান জমির পুরোটাই বেদখল হয়েছে।  

এদিন টালিগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত এই বেআইনি নির্মাণ পুলিশ ও পুরসভার কর্মীরা ভাঙতে গেলে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশের সঙ্গে বাদানুবাদ  বাধে স্থানীয়দের। ওই ওয়াকফ স্টেটের মুতাওয়াল্লি কমিটির সেক্রেটারি মুহাম্মদ শাহিদ আলম সংবাদ মাধ্যমকে সম্পত্তিতে বেআইনি দখল সম্পর্কে বলতে গেলে স্থানীয়রা তাঁকে ঘিরে ধরে ব্যাপক মারধর করে। শাহিদ আলম যাতে মিডিয়ার সামনে এই সম্পত্তি নিয়ে কোনও তথ্য তুলে ধরতে না পারে, এজন্য তাঁর উপর চড়াও হন স্থানীয়দের কয়েকজন। কোনওরকমভাবে পুলিশ শাহিদ আলমকে উদ্ধার করে নিরাপদের নিয়ে যায়। 

এদিন এই ওয়াকফ সম্পত্তিতে অবস্থিত পার্টি অফিস ভাঙার জন্য বুলডোজারও হাজির করে কলকাতা পুরসভার কর্মীরা।

  বেলা ১২ টার সময় ইলেকট্রিক বিচ্ছিন্ন করে ভাঙার কাজ শুরু হবে, ঠিক ওই সময় রবিবার দুপুরে দায়ের হওয়া এক মামলার ভিত্তিতে ৩০ দিনের স্থগিতাদেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্ট।  জরুরি শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের  বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী অন্তর্র্বতী স্থগিতাদেশ দেন। আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত ওই নির্মাণ ভাঙা যাবে না। বিল্ডিং ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হবে মালিককে। আদালত মামলাকারী অনিতা দাসকে নির্দেশ দিয়েছে যে, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে তাঁদের বাড়ির সমস্ত বৈধ নথিপত্র নিয়ে পুরসভার বিল্ডিং ট্রাইব্যুনালে  আবেদন জানাতে হবে। এরপরেই হবে পুরসভার পদক্ষেপ। ট্রাইব্যুনালে যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ির স্বপক্ষে সঠিক ও বৈধ নথি পেশ করতে ব্যর্থ হন মামলাকারীরা, তবেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ হিসেবে পুরসভা নিজের মতো করে কড়া ব্যবস্থা নিতে পারবে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, গত সপ্তাহে নির্মাণ ভাঙার উপর নোটিস দেওয়া হয়েছে। ভাঙার নোটিসের উপর ৩০ দিনের সময় দেওয়া উচিত ছিল পুরসভার। 

এই খবর চাউর হতেই উল্লাসে মেতে ওঠেন বস্তিবাসীরা। বস্তিবাসীদের প্রশ্ন, বিগত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা এখানে বসবাস করছে। বিগত সরকারের আমলেই তারা এখানে বসবাস শুরু করে। তখন তো কেউ বাধা দেয়নি। এদিকে স্থানীয় এক বয়স্ক মহিলা বলেন, ভিতরে এলাকায় কবর ছিল। ভগ্ন প্রায় মসজিদ, গম্বুজ, সৌধ রয়েছে। পবিত্র জায়গা। তাঁর প্রশ্ন, সেখানে কীভাবে বসবাস করছে। পবিত্র জায়গায় পায়খানা-পেচ্ছাব করা যায় না।

এই নিয়ে আপত্তির প্রয়োজন। এলাকার বাসিন্দাদের অনেকের অভিযোগ, ওই জায়গায় টিনের ছাউনি দিয়ে দুতলা-তিনতলা ছোটো ছোট বাড়ি বানাচ্ছে। আর সেগুলি চড়া দামে বিক্রি করছে, ভাড়ায় দিচ্ছে।

২০১৫ সালের আগে পর্যন্ত পুরাতন  মসজিদ, কবরগুলি অক্ষত অবস্থায় ছিল। অনেকেই কবরস্থান, মসজিদ দেখতে আসতেন। খেলার মাঠটিও খালি ছিল, এখন সেই মাঠটিতেও দখল হচ্ছে। এইভাবে জবর দখলে তৃণমূলের স্থানীয় কর্মীরা দায়ী ছিল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের অনেকেরই। তাদের আরও প্রশ্ন, বেআইনিভাবে ওয়াকফের জায়গায় বাড়ি করা হচ্ছে। সেখানে ইলেকট্রিক, জলের কানেকশন সহ অন্যান্য সুবিধা পাচ্ছে কীভাবে? স্থানীয় মহিলাদের একাংশের বক্তব্য, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে থাকেন। আচমকা যদি এভাবে ঘর ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে এখন  তাঁরা কোথায় যাবেন? যদিও এই বিল্ডিং ভাঙার জন্য আগেই নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পুলিশের তরফে বারংবার স্থানীয়দের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। এই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই এলাকায় চলে আসে বিপুল সংখ্যক পুলিশ। শুরু  হয় তীব্র উত্তেজনা।

পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ভবনটির একেবারে উপরের অংশ ও পিছনের জায়গা ওয়াকফ বোর্ডের সম্পত্তি। আর সেটাই দখল করে বসেছে এই এলাকার তৃণমূলের কর্মীরা। এক স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, ওই ভবনের উপরতলায় আগে তৃণমূলের পার্টি অফিস থাকলেও নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হতেই রাজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেখানে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন স্থানীয় কয়েকজন।

তার পিছনে থাকা বাড়িগুলিও জবরদ'ল করে তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। এ প্রসঙ্গে অবশ্য তৃণমূলের তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। অভিযোগ, টিপু পরিবারের এই সমাধিক্ষেত্রের বেশির ভাগ অংশে ঝুপড়ি তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস চলছে। বেদখল হওয়া হেরিটেজ সম্পত্তি উদ্ধারে ওয়াকফ বোর্ড, সংখ্যালঘু দফতর ও কলকাতা পুরসভাকে একাধিক বার চিঠি লিখেছেন টিপু সুলতানের বংশধর এস এম শাহিদ আলম। শাহিদ সাহেবের অভিযোগ, ধীরে ধীরে টিপু সুলতানের পরিবারের সমাধিক্ষেত্র জবরদখল করে পাকাপাকি ভাবে বাস করতে শুরু করেন স্থানীয়েরা। এখন সমাধিক্ষেত্রের প্রায় পুরোটাই দখল হয়ে গিয়েছে। হেরিটেজ সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন সরকারি মহলে বহু বার চিঠি দিয়েও কোনও কাজ হয়নি।’

কলকাতা পুরসভার খাতায় হেরিটেজ সম্পত্তির তালিকাভুক্ত টিপু সুলতানের পরিবারের সমাধিক্ষেত্রটি ৫১/১-এ সতীশ মুখার্জি রোডে অবস্থিত। কালীঘাট পার্কের পূর্ব দিকে ‘মাইসোর ফ্যামেলি ফতেহা ফাণ্ড ওয়াকফ এস্টেট’ নামে পরিচিত প্রায় ১২ বিঘার জমিটি পুরসভার নথিতে ‘গ্রেড ওয়ান হেরিটেজ’ বলে চিহ্নিত। এখানেই শায়িত রয়েছেন টিপু সুলতানের পুত্র-কন্যা-সহ পরিবারের সদস্যেরা। ওই ঐতিহ্যমণ্ডিত জায়গায় রয়েছে টিপুর জামাতা নিজামউদ্দিনের কবর। আঠারো শতকে ভারতে ইংরেজ বিরোধিতার অন্যতম প্রধান নায়ক টিপু সুলতানের পরিবারের স্বজনদের ঠাঁই হয়েছিল এই কলকাতায়। শ্রীরঙ্গপত্তনমের যুদ্ধে টিপু সুলতানের পরাজয় এবং মৃত্যুর পরে (১৭৯৯) প্রথমে তাঁদের রাখা হয়েছিল ভেলোর দুর্গে। সেখানেও বিদ্রোহ হওয়ায় টিপু সুলতানের পুত্র, কন্যা-সহ পুরো পরিবারকে কলকাতায় আনা হয়েছিল।

কালীঘাট ও টালিগঞ্জ অঞ্চলে অবস্থিত মহীশূর রাজপরিবার ও টিপু সুলতানের বংশধরদের ঐতিহাসিক সম্পত্তি ও সমাধিক্ষেত্র দেখাশোনা করার জন্য মাইসোর ফ্যামিলি ওয়াকফ এস্টেট  গঠিত হয়েছিল। ১৮০৬ সালে ব্রিটিশ সরকার টিপু সুলতানের পরিবারকে মহীশূর থেকে কলকাতায় নির্বাসনে পাঠানোর পর এই সম্পত্তি ও ট্রাস্টের সূচনা হয়। ঐতিহাসিক পটভূমি ও সম্পত্তি ১৮০৬ সালে টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কলকাতায় আনা হয়। তাদের বাসস্থান ও ধর্মীয় কাজের জন্য তৎকালীন ‘রসা পাগলা’ বা বর্তমান টালিগঞ্জ এলাকায় জমি বরাদ্দ করা হয় এবং মহল তৈরি হয়। এই পরিবারের উদ্যোগে কলকাতার ধর্মতলায় ঐতিহাসিক শাহি মসজিদ এবং টালিগঞ্জে মসজিদ নির্মিত করেন টিপু সুলতানের ছেলে প্রিন্স গোলাম মুহাম্মদ।