সেখ কুতুবউদ্দিন: বাবার নাম থাকলেও বাদ মায়ের নাম। আবার বাবা-মায়ের নাম থাকলেও তাঁদের সন্তানের নাম বাদ। এক ভাইয়ের নাম থাকলে অন্য ভাইয়ের নাম নেই। বিগত কয়েক মাস ধরে ভোটার লিস্টে নাম ‘ডিলিট’ নিয়ে দিশেহারা মানুষজন। এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের ট্রাইবুনালে আবেদন করতে বলা হয়। সমস্ত ডকুমেন্ট আপলোড করেছেন তাঁরা। ট্রাইবুনালে এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের আশা ছিল আবেদন করা হয়েছে ট্রাইবুনালে, ডাক পাবেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ডিলিট ভোটাররা নির্দেশ মোতাবেক ট্রাইবুনালে আবেদন ও ডকুমেন্ট সাবমিট সত্বেও তাদের অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে সিংহভাগই মুসলিম সম্প্রদায়ের।

এসআইআর চলাকালীন প্রথমে এদের নাম ‘অ্যান্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তারপর বিডিও অফিসের শুনানিতে অংশ নেয় ও নথি জমা দেয়। কিন্তু, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায় তাদের অনেকের নাম ‘ডিলিট’ হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয় তারা ভোটার তালিকায় নাম ফিরে পাওয়ার জন্য। এখন অভিযোগ, তাদের অনেকে ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়ার পরও তাদের শুনানির জন্য ডাকা হয়নি।

অথচ, জুডিশিয়াল অফিসাররা তাদের নাম ‘ডিলিট’ হিসেবে ফের চূড়ান্ত করে রায় দিয়ে দিয়েছে। ফলে এই ডিলিট ভোটররা চরম আতান্তরে পড়েছে। তাদের প্রশ্ন, ট্রাইব্যুনালে শুনানিই হল না, তা সত্ত্বেও কীভাবে, কিসের ভিত্তিতে তাদের নাম ডিলিট হয়ে গেল? এখন ভোটার তালিকায় থাকা তাদের নামের উপর লেখা রয়েছে ‘ডিলিটেড আফটার অ্যাডজুডিকেশন বাই জুডিশিয়াল অফিসার’ অর্থাৎ ‘বিচারকদের দ্বারা নিষ্পত্তির পর বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ আর এতেই ওই ভোটারদেরû মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

নাম বাদ ভোটারের এক আত্মীয় মঙ্গলকোট ব্লকের কৈচর-২ পঞ্চায়েতের বাসিন্দা সাইফুর রহমান এই বিষয়ে জানান, ভোটের আগে ২৭ লক্ষ নাম ডিলিট হয়েছিল। ওই ডিলিট ভোটারদের নির্বাচন কমিশন থেকে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে বলা হয়। সেইমতো এলাকার সকলেই আবেদন করেন। কিন্তু এ'ন নাম বাদ ভোটারদের অনেকের ‘অনলাইনে স্ট্যাটাস পেন্ডিং’ দেখাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে প্রায় ১০০ শতাংশই নামের উপর ‘ডিলিটেড আফটার অ্যাডজুডিকেশন বাই জুডিশিয়াল অফিসার’ লিখে দেওয়া হয়েছে। কোনও হেয়ারিং নোটিশ মেলেনি। তবুও ডিলিটেড লিখে দেওয়া হয়েছে। এ'ন কী করব বুঝতে পারছি না। এই বিষয়ে রাজ্য সরকার ও আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম-সহ একাধিক জেলায় একই কথা লিখে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই সাধারণ ঘরের মানু¡, খেটে  খাওয়া, পরিযায়ী। ট্রাবুনালে শুনানিই হয়নি। তার পরেও ডিলিট কীভাবে করা হল। কী করব  খুঁজে বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁরা। এই নিয়ে উদ্বেগে ভোটাররা

হাইকোর্টের বর্ষীয়ান আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য অবশ্য এইসব ডিলিট ভোটারদের উচ্চতর কোর্টে আবেদন করার  পরামর্শ দিয়েছেন। এই বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী শামিম আহমেদ বলেন, লড়াইয়ের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। রাস্তায় লড়াই করতে হবে। তাছাড়া বলব, ভারতীয় কি না এই নাগরিকত্ব প্রমাণ করার দায় আমাদের নয়, সরকারের। ডিলিট ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলব, এই নিয়ে আতঙ্কিত হবেন না। কলকাতা হাইকোর্টে ডিলিটেড ভোটারদের জন্য জনস্বার্থ মামলা দায়ের হতে পারে শীঘ্রই। এ দিকে, ভোটার তালিকায় নাম-বাদদের কেউ কেউ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেকেরই এ'নও পর্যন্ত কোনও সুরাহা হয়নি বলেও জানিয়েছেন নাম বাদ যাওয়া ভোটার ও  আইনজীবীরা। ভোটারদের অনেকেই পরিযায়ী, তাঁরা দূরে বা ভিন রাজ্য বা অন্য দেশে কর্মরত।

নাম বাদ যাওয়া এই ভোটাররা যদি আদালতে মামলা দায়ের করেন, তাহলে হাজিরা দেওয়ার সময় তাদের নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে আসতে হবে। এতে ওই সমস্ত মানুষদের কর্মক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানান নাম বাদ যাওয়া পরিযায়ীদের একাংশ।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ইন্তাজ আলি শাহের নামও ডিলিট ছিল। ডিলিটদের প্রসঙ্গে ইন্তাজ আলি শাহের প্রশ্ন, যাদের ডিলিটেড দেখানো হচ্ছে ভোটার তালিকায় তাঁরা সকলেই কি ভারতীয় নয়? তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার দায়িত্ব কার? অযথা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। টেনশনের মধ্যে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। এই নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা রয়েছে আগামী সপ্তাহে। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সাধারণ, প্রান্তিক মানুষরা বাদ থাকবে কেন? এই প্রসঙ্গে আদালত-সহ সংশ্লিষ্ট দফতরকে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে হবে। সম্প্রতি এসআইআর-এর নামে সাধারণ, প্রান্তিক মানুষের হয়রানির কারণে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী এবং কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরি। তিনি ‘পুবের কলম’ প্রতিবেদককে জানান, আগামী ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি রয়েছে। দেশের আদালতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা রয়েছে। নাম বাদ নায্য ভোটারদের সকলের জন্যই শীর্ষকোর্টে আবেদন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।