পুবের কলম, নয়াদিল্লি: পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার আড়ালে লক্ষাধিক মানুষের ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব সংকটের মুখে পড়েছে বলে দাবি করল ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস’ (এপিসিআর)। সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং বুথ লেভেল অফিসারদের সাক্ষ্য তুলে ধরে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনটি সাফ জানিয়েছে, গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার এবং কোনো যান্ত্রিক বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে তা হরণ করা অসাংবিধানিক।
 
এদিনের আলোচনা সভায় উঠে এসেছে, মালদা এবং মুর্শিদাবাদে বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও অসংখ্য মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মালদার সমাজকর্মী মহবুল হক জানান, মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং প্রশাসনিক অসংগতির কারণে বহু ক্ষেত্রে নাম বাদ পড়েছে। এমনকি এই কাজের চাপে কিছু বিএলও-র আত্মহত্যার মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়ার খবরও তিনি জানিয়েছেন। এমনকি বিএলও-দের নিজেদের নামও ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলার নজির সামনে এসেছে। তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে সাবির আহমেদ দাবি করেন, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম, মহিলা, রূপান্তরকামী, যৌনকর্মী এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আনুপাতিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে মুসলিম পুরুষদের নাম বাদ যাওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।
সভার মডারেটর বানোজ্যোৎস্না লাহিড়ী বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একটি পরিকল্পিত প্যাটার্ন, যেখানে মতুয়া সম্প্রদায় এবং পরিযায়ী শ্রমিকদেরও লক্ষ্য করা হয়েছে।
 
প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এই প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ছাড়া এভাবে গণহারে নিবিড় সংশোধন করার সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠিত স্বচ্ছতার নির্দেশিকাগুলোও এই প্রক্রিয়ায় মানা হচ্ছে না। অধ্যাপক অজিত ঝা এই প্রবণতাকে গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেন।
তাঁর মতে, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে সরকার ভোটারদের বেছে নিচ্ছে, ভোটাররা সরকারকে নয়।
 
এপিবিআর-এর জাতীয় সম্পাদক নাদিম খান অভিযোগ করেন, অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সদর্থক সাড়া মিলছে না। উল্টে নাম কাটার প্রতিবাদ করলে কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেক পোলিং স্টেশনে কয়েকশো নাম সংশোধনের জন্য পাঠানো হলেও একটিও অনুমোদন না পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
 
আলোচনা সভায় মৌসম নূর, নাদিম খান ও অন্যান্য বিশিষ্ট বক্তারা উপস্থিত ছিলেন। এদিন সভা থেকে দাবি তোলা হয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অবিলম্বে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া রোধে রক্ষাকবচ তৈরি করতে হবে। যে কোনো সংশোধন প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক নিয়ম মেনে চলতে হবে।